প্রেমের জন্য হারিয়ে যাওয়া এক তারকা

আহমেদ ফারুক | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ৬:০০ বিকাল

ভাগ্যশ্রী। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

হঠাৎ উত্থান, রাতারাতি তারকাখ্যাতি আর তারপর যেন অদৃশ্য হয়ে যাওয়া। ভাগ্যশ্রীর ক্যারিয়ারকে এভাবে বর্ণনা করলে খুব একটা ভুল হবে না। একটি চলচ্চিত্র দিয়েই তিনি যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তা অনেক অভিনেত্রীর সারা জীবনের অর্জনের সমান। অথচ ক্যারিয়ারের শীর্ষ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে তিনি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা আজও বলিউডের অন্যতম বড় ‘হয়তো’ হয়ে আছে।

১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ শুধু একটি প্রেমের গল্প ছিল না; এটি ছিল ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির এক যুগান্তকারী ঘটনা। চলচ্চিত্রটি যেমন সালমান খানকে তারকাখ্যাতির পথে নিয়ে যায়, তেমনি দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেন ভাগ্যশ্রী। সরলতা, সৌন্দর্য ও অভিনয়ের মিশেলে তিনি হয়ে ওঠেন নব্বই দশকের সম্ভাবনাময়ী নায়িকা। কিন্তু সবাই যখন তাঁর সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছিল, তখন ভাগ্যশ্রী বেছে নিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পথ।

তারকা হওয়ার আগেই প্রেমে পড়া
ভাগ্যশ্রীর গল্পটা অন্য অনেক বলিউড নায়িকার মতো নয়। চলচ্চিত্রজীবনের শুরুর আগেই তিনি প্রেমে পড়েছিলেন ব্যবসায়ী হিমালয় দাসানির। সেই প্রেম ছিল গভীর, আন্তরিক ও দীর্ঘদিনের।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ভাগ্যশ্রী স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, তিনি তখন খুবই তরুণী ও গভীরভাবে প্রেমে মগ্ন ছিলেন। তাঁর কাছে বিয়ে ও পরিবার গড়া ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নগুলোর একটি। ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ মুক্তির সময় তিনি ইতিমধ্যেই বিবাহিত ছিলেন, এমনকি সন্তানসম্ভবাও ছিলেন।

আজকের দিনে একজন অভিনেত্রীর জন্য পরিবার ও ক্যারিয়ার একসঙ্গে সামলানো তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও আশির দশকের শেষ দিকে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে সময় বলিউডে প্রচলিত ধারণা ছিল, নায়িকা হয় সংসার করবেন, নয়তো অভিনয় করবেন। দুই জগৎ একসঙ্গে ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব।
ভাগ্যশ্রী সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে নিজের অগ্রাধিকার ঠিক করেছিলেন। তিনি বেছে নিয়েছিলেন প্রেমকে।

prothomalo-bangla%2F2026-06-12%2F97kr34hp%2F8c8db876-4128-4742-9170-55957684d86a.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

যে সিদ্ধান্তে অবাক হয়েছিল বলিউড
‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’র অভাবনীয় সাফল্যের পর প্রযোজক-পরিচালকদের লাইন পড়ে গিয়েছিল ভাগ্যশ্রীর বাড়ির সামনে। নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে বড় তারকা হওয়ার সব উপকরণই তাঁর হাতে ছিল।

কিন্তু ঠিক তখনই তিনি এমন এক সিদ্ধান্ত নিলেন, যা তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
বিয়ের পর ভাগ্যশ্রী ঠিক করেন, চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও কেবল স্বামী হিমালয় দাসানির বিপরীতেই অভিনয় করবেন। সেই সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে আসে ‘কায়েদ মে হ্যায় বুলবুল’, ‘পায়াল’ ও ‘ত্যাগী’র মতো চলচ্চিত্র।

তখন হয়তো বিষয়টি তাঁর কাছে স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। একজন নববিবাহিত নারী হিসেবে স্বামীর সঙ্গে কাজ করাকে তিনি সহজ ও নিরাপদ পথ বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু দর্শক বিষয়টিকে সেভাবে গ্রহণ করেননি।
বহু বছর পর ভাগ্যশ্রী নিজেই স্বীকার করেন, সিদ্ধান্তটি ছিল তাঁর তরুণ বয়সের ভুলগুলোর একটি। তিনি দর্শকদের অনুভূতির কথা ভাবেননি, ভেবেছিলেন শুধু নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের কথা। এই সিদ্ধান্তই কার্যত তাঁর মূলধারার বলিউড ক্যারিয়ারের সম্ভাবনাকে থামিয়ে দেয়।

prothomalo%2Fimport%2Fmedia%2F2016%2F12%2F11%2Fd7df3985466d6b513d54be36f70f3f13-Bhagyashree4.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

যশ চোপড়ার বকুনি
কোনো অভিনেত্রী যদি ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকা অবস্থায় বলিউডের সবচেয়ে বড় নির্মাতাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন, তাহলে তাঁদের প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে? ভাগ্যশ্রীর ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছিল।

ভাগ্যশ্রী জানিয়েছেন, পরিচালক যশ চোপড়া তাঁর ওপর রীতিমতো রাগ করেছিলেন। শুধু যশ চোপড়াই নন, বলিউডের আরেক মহিরুহ মনমোহন দেশাইও তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। মনমোহন দেশাই নাকি তাঁকে বলেছিলেন, ‘শুধু হ্যাঁ বলো, আমি আগামীকালই ছবির ঘোষণা দিয়ে দেব।’

এই কথাগুলো শুনলে আজও অনেক চলচ্চিত্রপ্রেমীর মনে প্রশ্ন জাগে—যদি ভাগ্যশ্রী তখন প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করতেন, তাহলে কি বলিউডের ইতিহাস অন্য রকম হতো? সম্ভবত হতো। কারণ, সে সময় তিনি ছিলেন এমন এক তারকা, যাঁর জনপ্রিয়তা বিস্ফোরণের মতো ছিল। তাঁর পরবর্তী পথচলা হয়তো বদলে দিতে পারত নব্বই দশকের নায়িকাদের প্রতিযোগিতার মানচিত্র।

জুহি চাওলার সেই মন্তব্য
ভাগ্যশ্রীর সম্ভাবনা সম্পর্কে সমসাময়িক অভিনেত্রীরাও সচেতন ছিলেন। একবার অভিনেত্রী জুহি চাওলা তাঁকে মজা করে বলেছিলেন, ‘ভালোই হয়েছে তুমি ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে দিয়েছিলে, নইলে...’ বাকিটা না বললেও কথার অর্থ বুঝতে অসুবিধা হয় না।
সে সময় ভাগ্যশ্রীর জনপ্রিয়তা এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে অনেকে মনে করতেন, তিনি দীর্ঘ সময় বলিউডে থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠিত নায়িকার জন্য বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারতেন। তবে ভাগ্যশ্রী এই প্রতিযোগিতার ধারণায় বিশ্বাস করেন না। তাঁর মতে, সাফল্যের জন্য সবারই জায়গা আছে। একজন শিল্পী যদি নিজের কাজের প্রতি সৎ থাকেন, তাহলে দর্শকের ভালোবাসা তিনি পাবেনই।

আফসোস আছে, অনুশোচনা নেই
জীবনের এই পর্যায়ে এসে ভাগ্যশ্রী নিজের সিদ্ধান্তগুলোর দিকে ফিরে তাকান শান্ত দৃষ্টিতে। তিনি বলেন, অনুশোচনা নেই। কারণ, প্রতিটি সিদ্ধান্তই তিনি নিয়েছিলেন নিজের বিশ্বাস থেকে। তবে একটি আক্ষেপ অবশ্যই আছে—যশ চোপড়া, মনমোহন দেশাইয়ের মতো কিংবদন্তি নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ তিনি হারিয়েছেন।
এই আক্ষেপটা স্বাভাবিক। কারণ, একজন অভিনেত্রীর জন্য বড় পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করা শুধু ক্যারিয়ার নয়, শিল্পীসত্তারও বিকাশ ঘটায়।
তবু ভাগ্যশ্রী অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে চান না। তাঁর বিশ্বাস, জীবন সামনে এগিয়ে যাওয়ার নাম। পেছনে তাকিয়ে আফসোসে ডুবে থাকার নয়।

এক অন্য রকম সাফল্যের গল্প
বলিউডে সাফল্যের সংজ্ঞা সাধারণত জনপ্রিয়তা, পুরস্কার কিংবা দীর্ঘ ক্যারিয়ার দিয়ে মাপা হয়। সেই হিসেবে ভাগ্যশ্রী হয়তো অনেকের চোখে অসম্পূর্ণ এক গল্প। কিন্তু অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তাঁর জীবন একেবারেই আলাদা ধরনের সাফল্যের গল্প।
ভাগ্যশ্রী তারকাখ্যাতি পেয়েছিলেন, আবার ইচ্ছা করেই সেই আলো থেকে সরে এসেছিলেন। তিনি এমন এক জীবন বেছে নিয়েছিলেন, যেখানে পরিবার ছিল প্রথম অগ্রাধিকার। অনেকের কাছে সেটি ভুল সিদ্ধান্ত মনে হতে পারে, কিন্তু তাঁর কাছে সেটিই ছিল সুখের সংজ্ঞা।

আজকের দিনে যখন তারকারা ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাগত সাফল্যের ভারসাম্য নিয়ে কথা বলেন, তখন ভাগ্যশ্রীর গল্প নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কারণ, তিনি বহু বছর আগেই সেই কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন—ক্যারিয়ার নাকি পরিবার? তিনি বেছে নিয়েছিলেন পরিবারকে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.