ম্যাকাইয়ের ঠান্ডায় চনমনে অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ কী করবে

আহমেদ ফারুক | আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ৯:০৪ সকাল

ম্যাকাইয়ের বিমানবন্দরে লাগেজের জন্য অপেক্ষায় অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল | তারেক মাহমুদ

দেখে মনে হচ্ছিল না যে তাঁদের সময়টা ভালো যাচ্ছে না। মাত্রই ডারউইনে বাংলাদেশের কাছে ৯ উইকেটের বিশাল হার। সাবেক ক্রিকেটার ও সংবাদমাধ্যমের সমালোচনার ঝড়। অথচ প্যাট কামিন্স, স্টিভেন স্মিথরা কী নির্ভার!

কাল রাতে ম্যাকাই বিমানবন্দরে পৌঁছে লাগেজ বেল্টের পাশে অন্য যাত্রীদের সঙ্গে ব্যাগপত্রের জন্য অপেক্ষা করছিল অস্ট্রেলিয়া দলও। লাগেজ আসতে দেরি হচ্ছিল, কিন্তু সময়টা গল্প-আড্ডায় খারাপ কাটছিল না অস্ট্রেলিয়া দলের।

ম্যাকাইয়ের অভিষেক টেস্ট উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়া দল শহরে পা রাখায় বিমানবন্দরে দেখা গেল স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের, সাধারণ যাত্রীরাও উৎসুক হয়ে দেখছিলেন ক্রিকেটারদের। তবে অস্ট্রেলিয়া দলকে এতটাই নির্ভার মনে হলো যে কোনো কিছুকেই তারা খুব একটা তোয়াক্কা করল না। দীর্ঘ সময় খোশগল্পে মেতে থেকে লাগেজের জন্য অপেক্ষার পর যাঁর যাঁর ব্যাগপত্র নিয়ে বিমানবন্দর ছেড়েছেন সবাই।

লাগেজ বেল্টের ওখানে একটা বিষয় বিশেষভাবে দৃষ্টি কাড়ল। পাশাপাশি ঝোলানো হয়েছে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার বড় দুটি পতাকা। ম্যাকাই যেন তার অভিষেক টেস্টের জন্য বরণ করে নিল ইতিহাসের আরেকটি পাতায় নাম লেখাতে যাওয়া দুই দলকে।

অস্ট্রেলিয়া দলের আগে সন্ধ্যায় ম্যাকাইয়ে পৌঁছায় বাংলাদেশ দল। তবে ডারউইন থেকে ম্যাকাই পর্যন্ত পৌঁছাতে বেশ ভালোই ঝক্কিতে পড়েছে তারা। ডারউইন থেকে কেয়ার্নসের ফ্লাইট ছিল মঙ্গলবার সকাল সাতটায়। আর ম্যাকাইয়ে এসে সেই ভ্রমণ শেষ হয়েছে সন্ধ্যায় সাতটায়। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ার এক শহর থেকে আরেক শহরে আসতেই বাংলাদেশ দলের লেগে গেল ১২ ঘণ্টা!

কেয়ার্নসে লম্বা যাত্রাবিরতি শেষে বাংলাদেশ দলকে বহনকারী উড়োজাহাজ ডারউইনে আসার পথে থেমেছে টাউন্সভিলেও। দলের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিরক্তিকর ও অপ্রত্যাশিত সমস্যাটা হয়েছে সেখানেই। কী একটি টেকনিক্যাল কারণে টাউন্সভিলে উড়োজাহাজ দাঁড়িয়ে ছিল প্রায় দুই ঘণ্টা। এ দুই ঘণ্টা বিমানের ভেতরেই থাকতে হয়েছে দলকে। গতকালের দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তির কারণে শেষ পর্যন্ত আজকের নির্ধারিত অনুশীলনটাই বাতিল করে দিয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট।

ম্যাকাইয়ে এসে আরেকটি প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ দল পড়তে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ডারউইনের আবহাওয়া ছিল বেশ গরম, বলতে পারেন অনেকটাই বাংলাদেশের মতোই। কিন্তু ম্যাকাইয়ের পরিস্থিতি পুরো উল্টো। কাল রাতে এই শহরে নেমে দেখা গেল কনকনে ঠান্ডা বাতাস বইছে। তাপমাত্রা ১৭-১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো।

এটা অবশ্য অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। এশিয়ার সবচেয়ে কাছের ‘অস্ট্রেলিয়া’ ডারউইন ব্যতিক্রম, নইলে এই দেশে শীত মানেই কনকনে ঠান্ডা আবহাওয়া। বাংলাদেশ হাইপারফরম্যান্স দলের ব্যাটিং কোচ হয়ে বর্তমানে ডারউইনে আছেন খেলা ছাড়ার পর সপরিবার সিডনিতে থিতু হওয়া জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার ইমরুল কায়েস। এই মৌসুমে ম্যাকাইয়ের তাপমাত্রা যে এ রকমই থাকে, সেটা তিনিও বলেছেন। রাতে বেশ ঠান্ডা, দিনের বেলায়ও সর্বোচ্চ ২২-২৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা উঠতে পারে।

ম্যাকাইয়ের গ্রেট বেরিয়ার রিফ অ্যারেনা, যেটি রে মিচেল ওভাল হারাপ পার্ক নামেও পরিচিত; সেখানে এবারই প্রথম টেস্ট হবে, তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এখানে হয়েছে আগেও। মেয়েদের বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছাড়াও গত বছর অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ হয়েছে ম্যাকাইয়ের মাঠে। ছেলেদের আন্তর্জাতিক ম্যাচ অবশ্য গত বছরের আগে হয়েছে একবারই। ১৯৯২ বিশ্বকাপে ভারত-শ্রীলঙ্কা ম্যাচটা আয়োজন করেছিল এই শহর।

ম্যাকাইয়ের ক্রিকেট ঐতিহ্য অস্ট্রেলিয়ার বড় ক্রিকেট শহরগুলোর মতো দীর্ঘ না হলেও, কুইন্সল্যান্ডের আঞ্চলিক ক্রিকেট সংস্কৃতিতে শহরটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। এখানে ক্রিকেটের বিকাশ মূলত স্থানীয় ক্লাব, স্কুল ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতাকে ঘিরে। সময়ের সঙ্গে এখানকার ক্রিকেট অবকাঠামোর উন্নতি হয়ে শহরটি উত্তর কুইন্সল্যান্ডের ক্রিকেট প্রতিভা বিকাশের মূল কেন্দ্র হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।

ম্যাকাইয়ের ক্রিকেট ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরিচিতি বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া টেস্টের ভেন্যু গ্রেট বেরিয়ার রিফ অ্যারেনা। এটি শুধু শহরের প্রধান ক্রীড়া ভেন্যুগুলোর একটিই নয়, আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ক্রিকেট আয়োজনের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব এখন বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটের বিভিন্ন ম্যাচ এবং আন্তর্জাতিক দলের প্রস্তুতি ও সীমিত ওভারের ম্যাচ আয়োজন করে মাঠটি ধীরে ধীরে আরও শক্তভাবে ক্রিকেট মানচিত্রে জায়গা করে নিচ্ছে।

এই শহরের ক্রিকেট ঐতিহ্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক—ক্রিকেট এখানে শুধু পেশাদার খেলার মোড়কে নেই। স্থানীয় ক্লাব ক্রিকেট, জুনিয়র ক্রিকেট এবং স্কুল ক্রিকেট দীর্ঘদিন ধরেই এখানকার ক্রীড়া সংস্কৃতির অংশ। শহরের মাঠগুলোতে সপ্তাহান্তে জমে ওঠে ক্রিকেট ম্যাচ।

অস্ট্রেলিয়ার সাংবাদিকেরাও ডারউইন থেকে দল বেঁধে কাল এই শহরে এসেছেন। ম্যাকাইয়ের আবহাওয়ার কারণে বিমানবন্দরে তাঁদের একজনও মজার ছলে এই প্রতিবেদককে বললেন, ‘এবার কিন্তু আমরা তোমাদের কন্ডিশন থেকে আমাদের কন্ডিশনে এসেছি...!’

কথাটা ভুল নয়। এই শহরে পা রেখেই বোঝা গেছে, এবারের অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশের আসল ‘টেস্ট’টা ম্যাকাইতেই হবে। প্রথম কারণ, ম্যাকাইয়ের ঠান্ডা আবহাওয়া। আর দ্বিতীয় কারণ, এক টেস্ট হেরেও কাল রাতে এখানে আসা চনমনে অস্ট্রেলিয়া।

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.