ডারউইনে বাংলাদেশের ইতিহাস, চার দিনেই টেস্ট জয়

আহমেদ ফারুক | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ৪:৩৫ দুপুর

দুবার ফাটিয়ে হাততালি দিলেন অস্ট্রেলিয়ার অল্পসংখ্যক সমর্থক। প্রথমবার যখন অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের ২২৮ রানের লিড পেরিয়ে ইনিংস হার এড়াল। দ্বিতীয়বার ক্যামেরন গ্রিনের সেঞ্চুরির পর। বিরুদ্ধ–পরিস্থিতিতে অমন একটা সেঞ্চুরির জন্য বাহবা তো তিনি পেতেই পারেন।

তবে ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ দল আজ যে ইতিহাস লিখল, ওই দুটি হাততালি সেখানে বড় জোর পাদটীকা হয়ে থাকতে পারে। ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে বিজয়ীরা, পরাজিতদের নাম আসে প্রসঙ্গক্রমে। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ২৮৪ রানের মধ্যে একাই ১০৪ রান করা গ্রিনের জন্য তাই কেবলই সান্ত্বনা।

২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবার টেস্ট হারায় বাংলাদেশ। আজ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এল দ্বিতীয় জয়, সেটিও ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধান এবং এক দিনের বেশি সময় হাতে রেখেই।

বাংলাদেশ দলের ডারউইন–ইতিহাসের বেশির ভাগটা লেখা হয়ে গিয়েছিল টেস্টের প্রথম তিন দিনেই। তৃতীয় দিন শেষ বেলায় শুরু হয় উপসংহার লেখা, যেটি ক্রিকেটের বর্ণাঢ্য ভাষায় বাংলাদেশ লিখে শেষ করেছে আজ। ডারউইন তো বটেই, অস্ট্রেলিয়াতেই ২৩ বছর বছর পর টেস্ট খেলতে এসে এক দিনেরও বেশি সময় হাতে রেখে বাংলাদেশ ম্যাচ জিতে গেছে ৯ উইকেটে। গ্রিনের সেঞ্চুরিতে ইনিংস হার এড়ানো গেলেও দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের সামনে মাত্র ৫৭ রানেরই লক্ষ্য দিতে পেরেছিল ২৮৪ রানে অলআউট হওয়া অস্ট্রেলিয়া।

গ্রিন সেঞ্চুরি করেছেন, কিন্তু বাকি ব্যাটসম্যানরা শুধু মাঠে নামা আর ওঠার আনুষ্ঠানিকতাই সারলেন যেন। চতুর্থ দিন সকালের উইকেট থেকে মেহেদী হাসান মিরাজ যে টার্ন আর বাউন্স পেলেন, অস্ট্রেলিয়ার লেজটাকে গুটিয়ে দিয়েছে সেটাই। ইনিংসের ৬০তম ওভারে মিরাজের বাঁক খাওয়া একটা বল লাফিয়েও উঠেছিল একটু। ব্যাটের কানায় বল ছুঁইয়ে কট বিহাইন্ড ক্যারি। এরপর ৬৬, ৭৪ ও ৯৬তম ওভারে তিনি ফিরিয়েছেন বো ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স আর শেষ ব্যাটসম্যান নাথান লায়নকেও। সব মিলিয়ে ৬৬ রান দিয়ে টেস্টে ১৫তম বারের মতো ৫ উইকেট।

prothomalo-bangla%2F2026-08-16%2Fmbxv7dng%2FWhatsApp-Image-2026-08-16-at-10.14.54-AM.jpeg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নেন মিরাজ | শামসুল হক

লাঞ্চ–বিরতিতে মিরাজ সাবেক অস্ট্রেলিয়ান পেসার ও ধারাভাষ্যকার ব্রেন্ডন জুলিয়ানকে নিজের বোলিং নিয়ে বলেছেন, ‘সহজভাবে সবকিছু করতে চেয়েছি। অফ স্টাম্পের বাইরে (পিচে) প্রচুর ফুটমার্কস আছে, সেখানে বল ফেলার চেষ্টা করেছি। সব ওভারেই উইকেটের খোঁজ করিনি। এমন উইকেটে শৃঙ্খলা রেখে বোলিং গুরুত্বপূর্ণ।’

সেই শৃঙ্খলা তিনি ধরে রেখেছেন লাঞ্চের পরও। অবশ্য সেঞ্চুরি করা গ্রিনের উইকেটটা নিয়েছেন প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেওয়া পেসার হাসান মাহমুদ। দুই ইনিংস মিলিয়ে হাসান একাই নিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার ৯ উইকেট।

লাঞ্চের আগেই অস্ট্রেলিয়ার যাই যাই অবস্থা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার। বাংলাদেশের ৪২৬ থেকে ৬৭ রান দূরে থেকে দিনের খেলা শুরু, অস্ট্রেলিয়ার হাতে ছিল ৬ উইকেট। কিন্তু লাঞ্চের আগে প্রথম সেশনে ৩১ ওভার ব্যাটিং করেই তারা হারিয়ে ফেলে ৩ উইকেট এবং তিনটিই নেন মিরাজ। অস্ট্রেলিয়া অবশ্য তাঁর এই ঘূর্ণি তাণ্ডবের মধ্যেই প্রথম সেশনে ৮২ রান করে ইনিংস হার এড়ানো নিশ্চিত করে। লাঞ্চ করতে যায় ৭ উইকেটে ২৪৩ রান, ১৫ রানের লিড এবং ৩ উইকেট হাতে নিয়ে। লাঞ্চের পর ১১.১ ওভারের মধ্যে ড্রেসিংরুমে ফিরে যান গ্রিনসহ সেই ব্যাটসম্যানও।

৫৭ রানের লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশের জয়টা এরপর হয়ে দাঁড়ায় কেবলই আনুষ্ঠানিকতা। প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই বোল্ড হয়ে যান জস হ্যাজলউডের বলে। তবে আরেক ওপেনার সাদমান ইসলাম আর তিনে নামা অভিজ্ঞ মুমিনুল হক মিলে এরপর ইতিহাসের বাকিটা লিখেই মাঠ ছেড়েছেন বিজয়ের উৎসবে ভাসতে ভাসতে। সাদমান ২৫ আর মুমিনুল অপরাজিত ৩০ রানে। ওয়েবস্টারকে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে মারা বাউন্ডারিতে জয়সূচক রানটা করেছেন মুমিনুলই।

গ্যালারি থেকে তখন একটাই চিৎকার ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।’ অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিদের হাততালি আর সেই  চিৎকারে কিছু সময়ের জন্য ডারউইন যেন হয়ে উঠল সত্যিকারের বাংলাদেশ! ড্রেসিংরুমের সামনে ক্রিকেটাররা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে আবেগে ভাসছেন। ওদিকে ড্রেসিংরুম থেকে প্রেসবক্স—অস্ট্রলিয়ান শিবির তখন পুরোপুরি স্তব্ধ।

অবশ্য চতুর্থ দিনে টেস্টের সম্ভাব্য পরিণতি বুঝতে পেরে ছুটির দিনেও আজ খুব সামান্য কিছু অস্ট্রেলিয়ান দর্শকই মাঠে এসেছেন খেলা দেখতে। গ্যালারি প্রায় ফাঁকাই ছিল, মাঠের বাইরে ছিল না গত তিন দিনের উৎসবমুখর পরিবেশ। এমনকি স্টেডিয়ামের প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জ, যেটি মূলত ভিআইপি লাউঞ্জ হিসেবেই পরিচিত, সেখানেও প্রতিটি চেয়ার পড়ে থাকল শূন্য!

টেস্টের অন্য দিনগুলোতে বিলাসবহুল এই লাউঞ্জ সাবেক ক্রিকেটার, ক্রিকেট কর্মকর্তা এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে গমগম করেছে। সারা দিনের জন্যই থাকত বুফে খাওয়াদাওয়া আর নানা রকম পানীয়ের আয়োজন। অথচ আজ কিছুই ছিল না! পুরো লাউঞ্জ খালি, বসানো হয়নি খাবার টেবিল, সাজানো হয়নি খাবার।

লাউঞ্জের এক কর্মী জানালেন, ডারউইন টেস্ট তৃতীয় দিনের পর যাবে না ধরে নিয়ে চতুর্থ দিনের জন্য কেউ প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জের টিকিটই কাটেনি! শেষ পর্যন্ত টেস্ট চতুর্থ দিনে গেলেও অস্ট্রেলিয়ার অবস্থা যেহেতু শোচনীয়, নতুন করেও আর টিকিট বিক্রি হয়নি। তাই স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ কালই জানিয়ে দিয়েছে, প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জ আজ বন্ধ থাকবে।

বুঝতেই পারছেন, মাঠের খেলাটা অস্ট্রেলিয়া দল টেনেটুনে চার দিনে নিতে পারলেও ডারউইনের মানুষ হার মেনে নিয়েছিলেন তৃতীয় দিন শেষেই। ইতিহাসের পাতায় তাঁরা থাকবেন কী করে!

 

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.