গৃহপালিত গরুর জন্য ঘাস কাটতে বাড়ির বাইরে গিয়েছিলেন লাবনী আক্তার (৩৫)। ফেরার পথে শুরু হয় ঝড়–বৃষ্টি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বজ্রপাতে তাঁর মৃত্যু হয়। লাবনীর বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামে। একই উপজেলার কোষাডাঙ্গীপাড়ার কৃষক ইলিয়াস হোসেন (৩৭) মাঠে ফসল দেখতে গিয়ে ঝড়ের মধ্যে পড়েন। আর ঘরে ফেরা হয়নি। বজ্রপাতে সেখানেই থেমে যায় তাঁর জীবন।
এভাবেই গতকাল রোববার দেশের সাত জেলায় বজ্রপাতে ১৪ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছর এক দিনে এই দুর্যোগে এটাই সর্বাধিক প্রাণহানি। কিন্তু এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন ঋতুভিত্তিক পুনরাবৃত্ত দুর্যোগ। আর এর সবচেয়ে বড় শিকার মাঠে থাকা কৃষক, জেলে ও খোলা জায়গায় কাজ করা মানুষ।
এভাবে বজ্রপাতে প্রতিবছর কয়েক শ মানুষের মৃত্যু হলেও তা কমাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। বজ্রপাত কমাতে তালগাছ লাগানো, আশ্রয়কেন্দ্র করার মতো প্রকল্প হয়েছে। আগাম সতর্কসংকেত দেওয়ার কাজও করেছে কিছু প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাস্তবে সেগুলো কাজে আসছে না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বজ্রপাতে যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাঁরা খু্ব দরিদ্র মানুষ। তাঁদের নিয়ে তাই আমাদের মাথাব্যথা কম। যখন এক দিনে বেশি মানুষ মারা যান, তখন গণমাধ্যমের টনক নড়ে, সরকারের নানা দপ্তর সজাগ হয়। কিন্তু এ মৃত্যু রুখতে আগাম ও সুদূরপ্রসারী তৎপরতা নেই।’

বজ্রপাতে বছরে মৃত্যুর পরিসংখ্যান
মার্চে শুরু, মে মাসে চূড়ায়
বাংলাদেশে বজ্রপাতের মাসভিত্তিক প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারিতে সংখ্যা কম থাকলেও মার্চ থেকে তা বাড়তে শুরু করে। এপ্রিলে তা তীব্র হয়, আর মে মাসে পৌঁছায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এরপর জুন–জুলাইয়ে কমতে শুরু করে। সেপ্টেম্বরে আবার কিছুটা বাড়ে।
আন্তর্জাতিক আবহাওয়া প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান আর্থ নেটওয়ার্কসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট পালস কাউন্ট বা বজ্রঝলক মে মাসে হয় সর্বোচ্চ। মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়টিই এর জন্য সবচেয়ে সক্রিয় মৌসুম।
এ প্রবণতার সঙ্গে মিলে যায় প্রাণহানির তথ্যও। গত ১৫ বছরের বড় বড় মৃত্যুর ঘটনাগুলোর বেশির ভাগই এপ্রিল, মে বা জুনে ঘটেছে।
এক দিনের বড় প্রাণহানি: ইতিহাস যা বলছে
বাংলাদেশে বজ্রপাতে নিহত–আহত ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়মিত নথিভুক্ত করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরাম (বিএফডিএফ)। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যে এক দিনে বজ্রপাতে বড় প্রাণহানির কয়েকটি ঘটনা পাওয়া গেছে। তাতে দেখা যায়, এক দিনে সর্বোচ্চসংখ্যক মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটেছে ২০১১ সালের ২৩ মে, ৫৮ জন। ২০১৬ সালের ১২ ও ১৩ মে দুই দিনে ৮৭ জন নিহত হয়েছিলেন। দুই দিনে ৩৩ জন নিহত হন ২০১৪ সালের ১৩ ও ১৪ আগস্ট।
এ ছাড়া ২০২১ সালের ৬ জুন ৩৭ জন, ২০১৩ সালের ৬ মে ৩৩ জন, ২০২৪ সালের ৪ জুন ২৯ জন, ২০১৮ সালের ১০ মে ২৯ জন, ২০২২ সালের ১৭ জুন ২৪ জন, ২০২৩ সালের ২৩ মে ২৩ জন, ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল ২২ জন, ২০১২ সালের ৬ এপ্রিল ২০ জন, ২০১৫ সালের ২ মে ১৯ জন, ২০১৭ সালের ৯ মে ১৬ জন, ২০১৯ সালের ৭ জুলাই ১৫ জন, ২০২৪ সালের ৬ মে ১৫ জন, ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল ১৪ জন নিহত হন বজ্রপাতে।
এই তালিকা বলছে, বজ্রপাতের বড় ট্র্যাজেডি ঘুরেফিরে বছরের একই সময়ে হচ্ছে।

কোথায় সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত
ভৌগোলিক তথ্য বলছে, বজ্রপাত দেশের সব এলাকায় হলেও সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে। এ ছাড়া দেশের উত্তরাঞ্চলেও বজ্রপাতের সংখ্যা অন্য সব অঞ্চলের তুলনায় বেশি।
এর পেছনে আবহাওয়া ও জলবায়ুর সম্পর্ক আছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক। তিনি বাংলাদেশের বজ্রপাতের ধরন নিয়ে গবেষণা করেছেন।
আবুল কালাম মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, পানি বা জলাশয়ের নিকটবর্তী এলাকায় বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটে। এর মধ্যে আছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা এবং উত্তরাঞ্চল বিশেষত রংপুর অঞ্চল।
মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বঙ্গোপসাগরে বাষ্পীভবনের ফলে যে মেঘ সৃষ্টি হয়, তা সিলেট অঞ্চলে জলাশয় থেকে বাষ্পীভবনের ফলে সৃষ্ট মেঘের সঙ্গে মিলে বজ্রমেঘ তৈরি করে, যা বজ্রপাতের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
ভাইসালা এক্সওয়েদারের তথ্য বিশ্লেষণ করে আবুল কালাম মল্লিক জানান, সিলেটে বছরে ৮০-৯৬টি বিদ্যুৎ–ঝলক হয় প্রতি বর্গকিলোমিটারে। সেখানে যশোরে বছরে হয় ১২-৩২টি।
অর্থাৎ দেশের এক অঞ্চলের সঙ্গে আরেক অঞ্চলের পার্থক্য কয়েক গুণ। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও আশপাশের হাওর-সংলগ্ন এলাকায় ঝুঁকি অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেঘালয় পাহাড়ঘেরা ভৌগোলিক অবস্থান, আর্দ্র বায়ুপ্রবাহ, উষ্ণতা এবং বিস্তীর্ণ জলাভূমি—সব মিলিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চল বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।