দিনমজুর থেকে উদ্যোক্তা, বাঁশের হস্তশিল্পে সফল হাজীমুল

আহমেদ ফারুক | আপডেট: ২০ জুলাই ২০২৬, ৯:১৯ সকাল

বাঁশের তৈরি পণ্য হাতে উদ্যোক্তা হাজীমুল ইসলাম। বুধবার দুপুরে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের উত্তর সোনাখুলি গ্রামে

একসময় দিনমজুরের কাজ করতেন হাজীমুল ইসলাম (৫৫)। জীবিকার তাগিদে ওই কাজ করলেও মনে ছিল তাঁর নতুন কিছু করার ইচ্ছা। মাঝেমধ্যে অন্যের বাড়িতে বাঁশের মাচা তৈরির কাজও করতেন। একদিন মাচা তৈরির সময় তাঁর মাথায় আসে, বাঁশ ব্যবহার করে অন্য রকম কিছু করা যায় কি না। কৌতূহল থেকে ইউটিউবে খুঁজতে খুঁজতে পান বাঁশের তৈরি হস্তশিল্পের ভিডিও।

ইউটিউবে টানা কয়েক দিন বাঁশ দিয়ে তৈরি টেবিল ল্যাম্প, ঝাড়বাতি, মুঠোফোনের স্ট্যান্ড, ফুলদানিসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির ভিডিও দেখতে দেখতে একসময় কাজটি করার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন হাজীমুল। এটি আট বছর আগের কথা। ২০১৮ সালের শুরুর দিকে নিজের বাড়িতেই প্রথম ছোট পরিসরে শুরু করেন বাঁশের পণ্য তৈরির কাজ।

সংগ্রাম পেরিয়ে পণ্যের বাজারে তাঁর পণ্য

নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের উত্তর সোনাখুলি গ্রামের বাসিন্দা হাজীমুলের শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না। কাজ শুরুর দিকে তিনি কিছু ট্রে, টেবিল ল্যাম্প বানান। কিন্তু এসব বিক্রি হবে কোথায়? বিক্রি করতে পারতেন না। দিন দিন পরিবারে অভাব দেখা দেয়। সে সময় দিনমজুরের কাজও কম পেতেন। দিশাহারা হয়ে পড়েন হাজীমুল। তাঁর দিনাজপুরের এক বন্ধু মোহাম্মদ মিশু তাঁকে আশ্বস্ত করেন। তিনি হাজীমুলকে দিনাজপুরের কান্তজিউ মেলা, বদরগঞ্জের মেলা ও ঢাকার শিল্প মেলায় নিয়ে যান।

মেলায় গিয়ে হাজীমুল জানতে পারেন, তিনি যেসব পণ্য তৈরি করছেন, সেসবের ভালো চাহিদা রয়েছে। তাঁর মনোবল ফিরে আসে। বড় ছেলে আরিফুল ইসলামের সহায়তায় তিনি ফেসবুক পেজ খোলেন। সেখানে নিজের তৈরি পণ্যের ছবি প্রকাশ করেন। ঢাকার কয়েকটি শোরুম থেকে অর্ডার আসতে থাকে। ধীরে ধীরে ব্যবসা বাড়তে থাকলে ২০২০ সালে বাড়ির সামনে ভাড়া নেওয়া জমিতে ছোট একটি কারখানা গড়ে তোলেন। দিনমজুরের কাজ বাদ দেন। পণ্যের মান ও সৌন্দর্য আরও বাড়াতে কারখানায় কিছু মেশিন বসান। তাঁর কারখানায় এখন বাঁশের তৈরি প্রায় ১২০ ধরনের পণ্য তৈরি হয়। স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে এসব পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে ঢাকায়।

হাজীমুলের হস্তশিল্পের ক্রেতা ঢাকার ব্যবসায়ী মরিয়ম আকতার নিশাত। তিনি বলেন, বাঁশের তৈরি এসব পণ্য ব্যতিক্রমী। আমি এসব সংগ্রহ করি। ঢাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানে এসব পণ্যের চাহিদা আছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমরা এ হস্তশিল্প সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পারব।

ছোট কারখানায় বড় স্বপ্ন

বুধবার সকালে উত্তর সোনাখুলি গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, ছোট একটি কারখানায় চলছে ব্যস্ততা। কেউ বাঁশ কাটছেন, কেউ ঘষে মসৃণ করছেন, কেউ আবার তৈরি পণ্যে বিশেষ প্রলেপ দিচ্ছেন। এক কোণে বসে হাজীমুল একটি বাঁশের ট্রে তৈরির শেষ কাজ করছিলেন। বাঁশে বিশেষ রাসায়নিক প্রলেপ দিচ্ছিলেন, যাতে ঘুণ না ধরে।

সেখানে কথা হয় হাজীমুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। কারখানায় তাঁর স্ত্রীও কাজে সহযোগিতা করেন। তাঁদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে কলেজে পড়ে। ছোট দুজন পড়ে স্কুলে। কারখানাটি ছেলে আরিফুলের নামে। তিনিই প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজ পরিচালনা করেন। কারখানা চালু ও মেশিন সংগ্রহ করতে হাজীমুলের দুই লাখ টাকার পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা (বিসিক) নীলফামারী জেলা কার্যালয় থেকে এক লাখ টাকা বিনা সুদে ঋণ পেয়েছেন। বাকি এক লাখ টাকা তাঁর জমানো ছিল। তাঁর ভাষ্য, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সৈয়দপুরে হস্তশিল্পের বিকাশ সম্ভব।

prothomalo-bangla%2F2026-07-19%2Fho5witk7%2FWhatsApp-Image-2026-07-19-at-8.02.56-PM.jpeg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

কারখানায় হাজীমুলের সঙ্গে কাজ করছেন নারী শ্রমিক মিনতি দাস। বুধবার দুপুরে সৈয়দপুরের উত্তর সোনাখুলি গ্রামে

২০ জনের কর্মসংস্থান, মাসে তিন লাখ টাকার বিক্রি

দু–এক দিন পরপর ঢাকায় কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পণ্য পাঠান হাজীমুল। তাঁর কারখানায় ২০ জন নারী-পুরুষ কাজ করেন। দিনহাজিরা হিসেবে ১০ জন শ্রমিক প্রতিদিন মজুরি পান ৪০০ টাকা করে। বাকি ১০ জন ৩০০ টাকা করে পান। অর্ডার অনুযায়ী তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের শোপিস, আসবাব ও গৃহসজ্জার সামগ্রী।

পাঁচ বছর ধরে হাজীমুলের কারখানায় কাজ করছেন মিনতি দাস (৫০)। তিনি বলেন, ‘আমরা বাঁশের ট্রে, ঝাড়বাতি, দেয়ালঘড়ি, সোফা, খাট, টেবিল—অনেক ধরনের পণ্য বানাই। আমি বেশি ট্রে তৈরি করি। দিনে অন্তত ২০টি ট্রে বানাতে পারি। ১০ ঘণ্টা কাজ করে দৈনিক ৪০০ টাকা মজুরি পাই।’

প্রতিবেশী মমিনুল ইসলাম (৪৫) বলেন, ‘শুরুতে আমরা তার (হাজীমুল) কাজ দেখে হাসাহাসি করতাম। মনে হতো পাগলামি করছে। এখন বুঝেছি, আমরা ভুল ছিলাম। এখন আমরাও এই কারখানায় কাজ শিখতে আসি। ভবিষ্যতে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাই।’

হাজীমুল মুখে মুখে হিসাব দেন, প্রতি মাসে তাঁর বিক্রি প্রায় তিন লাখ টাকা। সব খরচ বাদ দিয়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা তাঁর আয় হয়। তাঁর কাছে সবচেয়ে কম দামি পণ্য মুঠোফোনের স্ট্যান্ড ও সাবানদানি। এগুলো বিক্রি হয় ৩০ থেকে ৫০ টাকায়। তবে সবচেয়ে বেশি চাহিদা টেবিল ল্যাম্পের। একেকটি টেবিল ল্যাম্প ৩০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। তিনি বলেন, এসব পণ্য তৈরির প্রধান উপকরণ হুতুম বাঁশ আনতে হয় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে। একেকটি বাঁশবাড়ি পর্যন্ত আনতে খরচ হয় ৭০০ টাকা। তবে নিজের জমিতে তিনি পরীক্ষামূলক হুতুম বাঁশ আবাদ শুরু করেছেন। বাঁশগুলো দু-এক বছরের মধ্যে ব্যবহার উপযোগী হয়ে উঠলে উৎপাদন ব্যয় কমে আসবে।

নতুন দিনের আশা

নান্দনিক পণ্য তৈরির পাশাপাশি হাজীমুলের কারখানায় কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে উল্লেখ করে বিসিকের নীলফামারী জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. নুরুল হক বলেন, ‘তাঁর এ যাত্রায় আমরা পাশে আছি। সারা দেশে তাঁর কাজ আমরা তুলে ধরতে চাই।’

হাজীমুলের ছেলে আরিফুল ইসলাম এবার সৈয়দপুরের কামারপুকুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘বাবাকে নিয়ে অনেক গর্ব আমার। আমি মনে করি, তিনি নিজ উদ্যোগে একটা ব্র্যান্ড তৈরি করেছেন। সময় পেলে আমিও বাবার কারখানায় শ্রম দিই। খুব ভালো লাগে। এভাবেই যদি প্রতিষ্ঠানটি চলতে থাকে তাহলে একদিন আমরা অনেক দূর এগিয়ে যাব। লেখাপড়া শেষ করে আমি যোগ দেব বাবার কারখানায়।’

 

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.