রুশ হামলায় ইউক্রেনে নষ্ট হয়েছে এক কোটির বেশি বই

আহমেদ ফারুক | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ৫:৪২ বিকাল

রুশ হামলায় ইউক্রেনের ক্ষতিগ্রস্ত একটি ছাপাখানার ধ্বংসাবশেষ | ফাইল ছবি: রয়টার্স

ছাপাখানাটির দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ভিক্টোরিয়া হাইদাই। নতুন শিক্ষাবর্ষ উপলক্ষে সেখানে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলার কথা ছিল। কিন্তু এখন ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় লন্ডভন্ড হয়ে গেছে কিয়েভের উপকণ্ঠে অবস্থিত এই ছাপাখানা। হামলার সময় নতুন শিক্ষাবর্ষের জন্য পুরোদমে ১৩ লাখ বই ছাপার কাজ চলছিল। এই সংখ্যাটি ইউক্রেনের স্কুলগুলোর মোট পাঠ্যবইয়ের প্রায় ১০ শতাংশ।

ছাপাখানার ধ্বংসস্তূপের ছাইয়ের মধ্যে পড়ে ছিল ইংরেজি ভাষার একটি পাঠ্যবইয়ের পোড়া পৃষ্ঠা। সেখানে লেখা, ‘আমার নাম উইলিয়াম। আমার বাড়ি যুক্তরাজ্যে। আমার দাদি নটিংহামে থাকেন। এটি একটি সুন্দর শহর।’

সম্প্রতি ইউক্রেনজুড়ে ছাপাখানা ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া। এসব হামলায় ১ কোটি ২০ লাখ বই নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইউক্রেনের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর ইউক্রেনে ছাপা হওয়া মোট বইয়ের এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস করেছে রাশিয়া।

কিয়েভের ওই ছাপাখানায় কোনো কিছুই আর উদ্ধারযোগ্য নেই। আগুন থেকে বেঁচে যাওয়া বইয়ের পাতাগুলোও অগ্নিনির্বাপণের পানি কিংবা খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকার কারণে নষ্ট হয়ে গেছে।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কনভির বাণিজ্যিক পরিচালক হাইদাই বলেন, ‘রাশিয়া ইচ্ছা করেই এসব করছে বলে আমি মনে করি। গত দুই মাসে সবচেয়ে বড় কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকেন্দ্র হামলায় ধ্বংস হয়েছে। এসব সরবরাহকেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক বই মজুত ছিল।’

হাইদাই বলেন, ‘ইউক্রেন জাতিকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে রাশিয়া। তাই ছাপাখানাগুলো ধ্বংস করছে তারা। তবে সত্যি বলতে, তারা সফল হবে না।’

গত কয়েক সপ্তাহে ইউক্রেনের ৩৫টির বেশি প্রকাশনা ও মুদ্রণ স্থাপনায় হামলা হয়েছে। শুধু নতুন বই-ই হামলার লক্ষ্য হয়নি, কিয়েভের পুরোনো বইয়ের বাজারেও হামলা হয়েছে। এতে শত শত বিক্রয়কেন্দ্র এবং অসংখ্য মূল্যবান বই ধ্বংস হয়েছে।

কিয়েভের ওই ছাপাখানায় অগ্নিনির্বাপণ কর্মীরা আগুন নেভানোর কাজ শেষ করার আগেই ২৮ বছর বয়সী বইবিষয়ক ব্লগার লিলিয়া ভেলিকা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি জ্বলতে থাকা ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে কিছু বই উদ্ধারের শেষ চেষ্টা করছিলেন। তাঁর হাতে ছিল ভিজে যাওয়া একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি।

লিলিয়া বলেন, ‘বই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। এগুলো হারানো মানে আমাদের হৃদয় হারিয়ে ফেলার মতো।’

ইউক্রেনের বিভিন্ন জাদুঘর, আর্ট গ্যালারি, ফিল্ম স্টুডিও, গ্রন্থাগার এবং অপেরা হাউসগুলোও যুদ্ধে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইউক্রেনের সংস্কৃতিমন্ত্রী তেতিয়ানা বেরেজনা বলেন, ‘রাশিয়া আমাদের দীর্ঘদিনের ইতিহাসের প্রতীক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।’

তেতিয়ানা জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত রাশিয়া ইউক্রেনের ১ হাজার ৯০০-এর বেশি ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন এবং ২ হাজারের বেশি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা চালিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শিল্প ও সাহিত্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং শিশুদের পড়াশোনা সচল রাখতে এখন ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, এই মুহূর্তে ইউক্রেনের পুরো প্রকাশনাশিল্পই চরম হুমকির মুখে পড়েছে এবং এই খাতটিকে বাঁচিয়ে রাখতে অনতিবিলম্বে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন।

যুক্তরাজ্যে অবস্থিত রুশ দূতাবাস বিবিসির কাছে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউক্রেনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংসের জন্য উল্টো দেশটির সরকারকেই দায়ী করেছে। তাদের দাবি, ইউক্রেন নিজেরাই নিজেদের পুরোনো স্মৃতিস্তম্ভগুলো ভেঙে ফেলছে এবং রাস্তাঘাটের নাম বদলে দিচ্ছে। ইউক্রেনীয় বাহিনী তাদের সামরিক স্থাপনা ও অস্ত্র লুকিয়ে রাখার জন্য এসব সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোকে ব্যবহার করছে।

ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে রাশিয়া বরাবরই দাবি করে আসছে যে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় না।

 

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.