জামদানি কি শাড়িতেই সেরা, তরুণেরা কী ভাবছেন

John Smith | আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯:১৯ সকাল

জামদানি দিয়ে এখন তৈরি হচ্ছে নতুন ধাঁচের পোশাক। তবে ঐতিহ্যবাহী নকশা করা শাড়ির প্রতিও আগ্রহ দেখাচ্ছেন তরুণ প্রজন্ম। বিশেষ দিনে সাজার সময় জামদানি শাড়ি বেছে নিচ্ছেন তাঁরা।

একসময় জামদানির প্রয়োগ সীমাবদ্ধ ছিল শাড়িতে। এরপর আসে কামিজ, ওড়না কিংবা পাঞ্জাবির মতো পরিচিত পোশাকে। কিন্তু এখন সেই গণ্ডি ভেঙে নানা রকম আধুনিক ও সৃজনশীল পোশাকে রূপ নিচ্ছে জামদানি।

ডিজাইনারদের নানামুখী পরীক্ষা–নিরীক্ষায় তৈরি হচ্ছে নতুন ধারা, নতুন আঙ্গিক। এমনকি অনেকেই মা, নানি বা দাদির পুরোনো জামদানি শাড়িকে নতুনভাবে ব্যবহার করে বানাচ্ছেন সমসাময়িক পোশাক; ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিলমিশে প্রোজ্বল হচ্ছে টেকসই ফ্যাশন। তথাপি সব পরিবর্তনের মধ্যেও শাড়ি তার নিজস্ব মহিমায় অটুট।

prothomalo-bangla%2F2026-04-20%2Ffxvm13x9%2F040A6372.JPG?w=1536&auto=format%2Ccompress&fmt=webp

ইদানীং কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে জামদানি শাড়ি পরার আগ্রহ ঐতিহ্যের প্রতি নতুন করে আস্থা জাগাচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, এই ইতিবাচক অথচ পরিবর্তনশীল প্রবণতা কি আমাদের ফ্যাশন ডিজাইনার বা ব্র্যান্ডগুলোর দৃষ্টিতে পড়ছে? যদি পড়ত, তবে হয়তো আমরা আরও পরিকল্পিত উদ্যোগ দেখতে পেতাম।

তরুণদের মধ্যে জামদানি শাড়ির প্রতি আকর্ষণ ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে; একে বলা যেতে পারে নীরব, অথচ গভীর সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ। পয়লা বৈশাখের বিকেলে দুই তরুণীকে দেখেছিলাম অপূর্ব লাল-সাদা জামদানি শাড়িতে। মনে হয় দুই বোন।

পরিপাটি করে পরা, নিখুঁত ভঙ্গিতে বহন করা; দৃষ্টি স্বতঃস্ফূর্তভাবে আটকে যায় ওদের দিকে। এমন দৃশ্য যে প্রতিদিন চোখে পড়ে তা নয়; তবে মাঝেমধ্যে যখন দেখা মেলে, তখন স্পষ্টতই অনুভব করি জামদানির প্রতি টান এখন আর কেবল প্রজন্মান্তরের ঐতিহ্যবাহী নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; তরুণ প্রজন্মও সমানভাবে মুগ্ধ।

prothomalo-bangla%2F2026-04-20%2Fcbbka1s6%2F040A6532.JPG?w=1536&auto=format%2Ccompress&fmt=webp

ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যায় জামদানির জন্মকালে শাড়ির প্রচলন আজকের মতো ছিল না। নবাব-বাদশাহ কিংবা তাঁদের পরিবারের নারীরা শাড়ি নয়, গজ কাপড় ব্যবহার করতেন। সেই সময়ের সাধারণ মানুষের পক্ষে জামদানি পরা ছিল প্রায় অসম্ভব বিলাসিতা; এ কথা আজও পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না।

তবে সময় বদলেছে, রুচি বদলেছে, সেই সঙ্গে বদলেছে জামদানির ব্যবহারও। তরুণদের উপযোগী করে জামদানি শাড়ি তৈরি করা গেলে একদিকে যেমন নতুন বাজার তৈরি হতো, অন্যদিকে তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতো এই ঐতিহ্যবাহী শাড়িকে।

এর জন্য শিল্পমান বা ঐতিহ্যের সঙ্গে আপস করার প্রয়োজন নেই। বরং জামদানির চিরায়ত মোটিফগুলোকে নতুন বিন্যাসে সাজিয়ে, একটু ভিন্ন লে-আউট তৈরি করলেই তা হয়ে উঠতে পারে আরও গ্রহণযোগ্য।

একই সঙ্গে ১০০ কাউন্টের সুতার পরিবর্তে ৬০ বা ৮০ কাউন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে, মোটিফের ঘনত্ব কিছুটা কমানো যেতে পারে, পাড় ও আঁচলে আনা যেতে পারে নতুনত্ব; সামান্য অথচ কার্যকর এই পরিবর্তনগুলোই উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে। ফলে জামদানি হয়ে উঠতে পারে আরও সুলভ।

তরুণীদের মধ্যে জামদানি শাড়ির প্রতি যে ক্রমবর্ধমান আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখতে হলে তাঁদের রুচি ও সামর্থ্যকে গুরুত্ব দিয়েই তাঁদের উপযোগী করে জামদানি তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি এই ঐতিহ্যবাহী শাড়ি সম্পর্কে তাঁদের যথাযথভাবে সচেতন করে তোলাও জরুরি।

তাহলে তাঁরা সহজেই আসল জামদানি ও মেশিনে তৈরি নকল জামদানির মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন শিক্ষক ও ফ্যাশন বিশেষজ্ঞ ফারজানা ইউসুফ। তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্মের তরুণীরা যথেষ্ট সচেতন।

বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে তাঁরা হাতে তৈরি পণ্য, বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রের মূল্য ও গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেন। বিশ্বজুড়ে এখন হ্যান্ডমেড পণ্যের প্রতি যে চলতি ধারা তৈরি হয়েছে, সেটিকে আমাদেরও কাজে লাগানো উচিত বলে মত দেন তিনি।

তবে বর্তমানে ভুল মোটিফ ব্যবহার করে জামদানি বোনা কিংবা জরি, চুমকি ও পুঁথি দিয়ে অপ্রাসঙ্গিক ভ্যালু অ্যাডিশন করার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এটি যে জামদানির প্রকৃত সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের পরিপন্থী, সে বিষয়ে তরুণীদের অবহিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পাশাপাশি বয়নশিল্পীদের নতুন প্রজন্ম—তাঁদের সন্তানেরাও এখন সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়। তাঁরা নিয়মিতভাবে জামদানি সম্পর্কে নানা তথ্য ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন, যা তরুণীদের মধ্যে সচেতনতা ও আগ্রহ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

বস্তুত এখনই সময় তরুণীদের জামদানি শাড়ির প্রতি আগ্রহ ধরে রাখার উদ্যোগ নেওয়ার। কারণ, জামদানি শুধু একটি পোশাক নয়; বরং আমাদের অনন্য বয়নশিল্প, আমাদের নান্দনিকতা, আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক।

 

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.