যেভাবে ১০টি আবেদনেই মিলতে পারে চাকরি

আহমেদ ফারুক | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১:০৯ দুপুর

সিভি হাতে চাকরি প্রার্থীরা

চাকরি খুঁজছেন। প্রতিদিন নতুন নতুন বিজ্ঞপ্তি দেখছেন। যোগ্যতা মিললেই আবেদন করছেন। এক সপ্তাহে ১০টি, এক মাসে ৫০টি—কখনো সংখ্যাটি ১০০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তবু কাঙ্ক্ষিত ফোনটি আসছে না।

এবার কৌশলটা একটু বদলে নিন। শত শত জায়গায় আবেদন না করে নিজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ১০টি পদ বেছে নিন। এরপর প্রতিটি পদের জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নিয়ে আবেদন করুন। এতে আপনার আবেদনের সংখ্যা কমবে। কিন্তু প্রতিটি আবেদনের মান বাড়বে এবং ডাক পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক গুণ বেড়ে যাবে।

আন্তর্জাতিক গবেষণাও এই কৌশলের পক্ষে কথা বলছে। মার্কিন চাকরির ওয়েবসাইট ইনডিডের ‘জব অ্যাপ্লিকেশনস কোয়ালিটি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যাঁরা ঢালাওভাবে অতিরিক্ত আবেদন করেন, তাঁদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা মানসম্মত আবেদনকারীদের চেয়ে ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত কম হয়। আবার বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের রিপোর্ট ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫’-এর তথ্যানুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে চাকরির বাজারে প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মদক্ষতার পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। এই গবেষণায় অংশ নেওয়া ৬৩ শতাংশ নিয়োগদাতাই সঠিক দক্ষতার কর্মী না পাওয়াকে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে এখন গণহারে ডিগ্রির চেয়ে প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট দক্ষতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

আগে বাছাই, পরে আবেদন

একজন চাকরিপ্রার্থীর প্রথম কাজ নিজের পছন্দ ও যোগ্যতার সঙ্গে মেলে এমন বিজ্ঞপ্তির তালিকা করা। ধরা যাক, এক মাসে আপনি ৫০টি বিজ্ঞপ্তি দেখলেন। সেখান থেকে শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা মিলিয়ে সেরা ১০টি পদ বেছে নিন।

এতে প্রতিটি আবেদনের পেছনে পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানটি ঠিক কী ধরনের কর্মী চাইছে, কোন কাজগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে—তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে নিজের আবেদন সাজাতে হবে। ইনডিডের ‘হাউ টু টেইলার ইউর রিজুমি’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢালাওভাবে আবেদন না করে নির্দিষ্ট পদের কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনবৃত্তান্ত তৈরি করাই একজন প্রার্থীর ইন্টারভিউ কল পাওয়ার মূল চাবিকাঠি।

একই জীবনবৃত্তান্তে চাকরি মিলবে না

অনেক চাকরিপ্রার্থী একটি জীবনবৃত্তান্ত বানিয়ে সব প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পছন্দ করেন। এতে সময় বাঁচে। কিন্তু একই সঙ্গে নির্দিষ্ট পদের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতাগুলো নিয়োগদাতার চোখে আড়ালে পড়ে যায়।

যেমন কোনো বিক্রয় প্রতিনিধি পদের জন্য আপনার যে যোগাযোগের দক্ষতা ও গ্রাহকসেবার অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, একটি তথ্য বিশ্লেষণ পদের জন্য তা কার্যকর না–ও হতে পারে। আবার গবেষণা পদের জন্য আপনার লেখার ও তথ্যের নিখুঁত পর্যালোচনার দক্ষতা সামনে আনা প্রয়োজন। তাই এক জীবনবৃত্তান্ত সর্বত্র ব্যবহার না করে প্রতিটি পদের প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে প্রাসঙ্গিক অংশগুলো আলাদাভাবে ফুটিয়ে তোলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

দক্ষতার সঙ্গে পদের মিল কতখানি

শুধু ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা থাকলেই আবেদন করার দরকার নেই। নিজের সুনির্দিষ্ট দক্ষতা ওই পদের কাজের সঙ্গে কতটা মেলে, সেটিও দেখতে হবে।

‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫’ গবেষণার তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে নিয়োগদাতাদের কাছে সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন দক্ষতাগুলোর শীর্ষে রয়েছে বিশ্লেষণী ও সৃজনশীল চিন্তা, স্থিতিস্থাপকতা, নমনীয়তা এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ। প্রতি ৭টির মধ্যে অন্তত ৫টি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান এখন এই মানসিকতাকেই মূল্যায়ন করছে। বাংলাদেশের চাকরিপ্রার্থীদেরও বুঝতে হবে যে তিনি কী কাজ পারেন তার চেয়ে নির্দিষ্ট পদের ক্ষেত্রে সেই কাজের প্রয়োগ কতটা কার্যকর হবে, তা উপস্থাপন করাই আসল কৌশল।

১০টি আবেদনকে সফল করবেন যেভাবে

শত শত ব্যর্থ আবেদনের বদলে সেরা ১০টি সুযোগকে কাজে লাগাতে এই ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন:

বিজ্ঞপ্তি ও প্রতিষ্ঠান বিশ্লেষণ: পদের মূল দায়িত্ব ভালো করে বুঝুন। প্রতিষ্ঠানটির কাজের ধরন ও তারা কেমন কর্মী খুঁজছে, তা খতিয়ে দেখুন।

লক্ষ্যভিত্তিক জীবনবৃত্তান্ত: বিজ্ঞপ্তির প্রধান শর্তগুলোর সঙ্গে নিজের কোন দক্ষতা বা অভিজ্ঞতাটি মিলে যায়, জীবনবৃত্তান্তে সেটিকে সবার ওপরে বা স্পষ্টভাবে তুলে ধরুন।

কাজের নির্দিষ্ট প্রমাণ দিন: ‘আমি কঠোর পরিশ্রমী’ বা ‘দক্ষ’—এমন সাধারণ দাবির বদলে আগে কোথায় কী সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তার নির্দিষ্ট উদাহরণ সংক্ষেপে তুলে ধরুন।

কভার লেটারে ব্যক্তিগত মতামত দিন: প্রতিষ্ঠানটিকে কেন আপনার পছন্দ এবং ওই সুনির্দিষ্ট পদের জন্য আপনি কেন মানানসই, তা সংক্ষেপে কভার লেটারে লিখে জানান।

ই–মেইলের বিষয়বস্তু স্পষ্ট রাখুন: ই–মেইলে আবেদনের ক্ষেত্রে সাবজেক্ট লাইনে পদের নাম ও আপনার নাম স্পষ্টভাবে লিখুন। এটি নিয়োগদাতার নজর কাড়তে সাহায্য করে।

অনলাইন প্রোফাইল গোছানো: জীবনবৃত্তান্তের পাশাপাশি নিজের লিংকডইন বা পেশাদার অনলাইন প্রোফাইল নিয়মিত হালনাগাদ রাখুন। অনেক নিয়োগদাতা আবেদন পাওয়ার পর অনলাইন প্রোফাইল যাচাই করেন।

প্রয়োজনে ফলোআপ করা: আবেদন জমা দেওয়ার এক বা দুই সপ্তাহ পর নম্রভাবে আবেদনের হালনাগাদ জানতে মেসেজ বা ই–মেইল পাঠাতে পারেন। এতে পদের প্রতি আপনার আগ্রহ প্রকাশ পায়।

চাকরি পাওয়ার নিশ্চিত কোনো জাদুকরি সূত্র নেই। কিন্তু প্রতিযোগিতা যখন তীব্র, তখন আবেদনের সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ নেই। শত শত ভুল জায়গায় দরখাস্ত না পাঠিয়ে সঠিক সুযোগটি বেছে নিন। নিজের আসল দক্ষতা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলুন।

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.