ভুল হয়ে থাকলে দুঃখ প্রকাশ করছি, কিন্তু কোনো ভুল করিনি, বললেন ইশরাক

আহমেদ ফারুক | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৫:১১ বিকাল

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে আবারও অস্ত্রকাণ্ডের পক্ষে কথা বলেছেন ইশরাক হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘যদি আমার দ্বারা কোনো ভুল হয়ে থাকে, আমি কাউকে আঘাতপ্রাপ্ত করে থাকি এই অভিযানের মাধ্যমে, সেটার জন্য আগে আমি দুঃখ প্রকাশ করে নিচ্ছি। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমি কোনো ভুল সেদিন করিনি।

আমি কেবল আমার নিরাপত্তার জন্য আমার হাতে অস্ত্রটুকু যতটুকু সময় প্রয়োজন রেখেছিলাম, পরবর্তীকালে সেটি আর আমার দৃশ্যমান হয়নি।’

prothomalo-bangla%2F2026-10-19%2Fvob76xtq%2FWhatsApp_Image_2026_10_19_at_1_49_41_PM.jpeg?w=1536&auto=format%2Ccompress&fmt=webp

আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এ সংবাদ সম্মেলন হয়। পূর্বঘোষিত এ সংবাদ সম্মেলন করার উদ্দেশ্যে বেলা পৌনে দুইটার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে নেতা–কর্মীদের নিয়ে ঢোকেন ইশরাক হোসেন। এ সময় তাঁর অনুসারীরা ‘রাজপথের ইশরাক ভাই, আমরা তোমায় ভুলি নাই’, ‘ইশরাক ভাই ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’, ‘মাদকের আস্তানা, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’ প্রভৃতি স্লোগান দিতে থাকেন। সংবাদ সম্মেলন শুরু হয় বেলা দুটোর দিকে।

সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগ প্রসঙ্গে ইশরাক হোসেন বলেন, ‘আজকের দিন থেকে আমি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আমি তাঁকে বলেছি, পুরো সময়টাতে ঢাকা-৬ আসন, পার্শ্ববর্তী এলাকা, পরবর্তী সময়ে আরও যদি এলাকা থাকে, সেখানকার মাদক নির্মূল এবং আমাদের জাতীয় জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চাই। তিনি সদয় সম্মত হয়েছেন এবং আমাকে সুযোগ করে দিয়েছেন—“ঠিক আছে যাও, এলাকা ঠিক করে এলাকায় কাজ করো।’”

ইশরাক হোসেন আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে তাঁকে তাঁর প্রথম মন্ত্রিসভায় স্থান দেন। তিনি দাবি করেন, তিনি দেশের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি বলেন, ‘আজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপন করতে এসেছি, যা দু-তিন দিন ধরে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ বিষয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নানা ধরনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিছু সত্য, কিছুটা অতিরঞ্জিত নানা ধরনের খবর প্রকাশ পেয়েছে। আমি আজকে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি মূলত ওই দিন ঠিক কী ঘটেছিল, সেটির বিস্তারিত তুলে ধরতে।’

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঘুণ্টিঘরে গিয়েছিলেন উল্লেখ করে ইশরাক হোসেন বলেন, তাঁরা থানাকে জানিয়ে সেখানে যান। তাঁর লাইসেন্স করা অস্ত্র সব সময় কোমরে থাকে। তিনি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নেন, যাতে কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে রক্ষা করতে পারেন। যে ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, তার মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে মাদকাসক্তদের হাতে অস্ত্র নেই।

ওই ঘটনার পর পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন বলে জানান ইশরাক। তিনি বলেন, এরপর রাতে দেখতে পান একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে এবং গণমাধ্যমে বিভিন্ন শিরোনামে প্রতিবেদন হয়েছে। ঘটনার দিন প্রধানমন্ত্রী ১৩টি জায়গা পরিদর্শন করেছিলেন, যেটি প্রশংসনীয় ছিল। কিন্তু তাঁর (ইশরাক) ঘটনা গণমাধ্যমে যেভাবে এসেছে, তাতে প্রধানমন্ত্রীর ঘটনাগুলো ঢাকা পড়ে গেছে।

পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁর কাছে মাদকের ভয়াবহতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন বলে উল্লেখ করে ইশরাক হোসেন বলেন, সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন যে তিনি পদত্যাগ করতে চান। তাঁর কারণে যাতে প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড ম্লান না হয়ে যায়, সে কারণেই এ কথা বলেছেন। তবে মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান চলবে বলে ঘোষণা দেন ইশরাক।

সংবাদ সম্মেলন শেষ করে নেতা–কর্মীদের নিয়ে প্রেসক্লাব ভবনের তিনতলা থেকে নিচে নেমে আসেন ইশরাক হোসেন। এ সময়ও নেতা–কর্মীরা তাঁকে ঘিরে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। প্রেসক্লাবের প্রাঙ্গণে নিজের গাড়িতে চড়ে নেতা–কর্মীদের উদ্দেশে হাত নাড়েন ইশরাক। এরপর গাড়ির ছাদ খুলে হ্যান্ডমাইকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। সেখানে নিজের পদত্যাগের ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেন এই সংসদ সদস্য।

বক্তব্য শেষে গাড়িতে দাঁড়িয়ে নেতা–কর্মীদের অভিবাদন জানিয়ে বেলা ২টা ৫৬ মিনিটের দিকে প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে যান ইশরাক হোসেন। তাঁকে বহনকারী গাড়ি প্রেসক্লাবের সামনে থেকে বেরিয়ে শিক্ষা ভবন হয়ে সচিবালয়ের পথে যায়। এরপর জিরো পয়েন্ট ধরে গোপীবাগের দিকে যান ইশরাক হোসেন। এ সময়ও তাঁর সঙ্গে নেতা–কর্মীরা ছিলেন।

গতকাল রোববার সরকারসংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সূত্রগুলো জানিয়েছে, গতকাল বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাককে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। সেখানেই তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়।

গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়া ঘুণ্টিঘরে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে নামেন ইশরাক হোসেন। তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র ছিল। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে একজন প্রতিমন্ত্রীর এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে অভিযানে অংশ নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ঘটনাটি নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিস্থিতি দেখতে আকস্মিক পরিদর্শন করছেন, তখন একজন প্রতিমন্ত্রীর এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রত করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

অবশ্য সমালোচনার মুখে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইশরাক হোসেন দাবি করেছিলেন, তিনি মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে সেখানে গিয়েছিলেন। পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে ওই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল।

পরে গতকাল রাত ১০টার দিকে ‘মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করে প্রথম আলো। এ খবর প্রকাশের পর একের পর এক ফেসবুক পোস্ট ও হোয়াটসঅ্যাপে অডিও বার্তা দিয়ে সংবাদটিকে ‘গুজব’ বলে দাবি করেছিলেন ইশরাক। তাঁর প্রেস কর্মকর্তাও সংবাদটিকে ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’ দাবি করে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তবে আজ সকাল সাড়ে আটটার পর নিজেই ফেসবুকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক। পরে দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন তিনি।

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.