হামের রোগীর ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে এডিনো ভাইরাস

আহমেদ ফারুক | আপডেট: ৩ আগস্ট ২০২৬, ৯:৩০ সকাল

হামে আক্রান্ত আট মাসের রওজাতুল জিকরাকে নিয়ে রাজধানীর মধ্য বাড্ডা থেকে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে এসেছেন মা মাসুমা আক্তার। গতকাল দুপুরে | ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

হামের রোগী এডিনো ভাইরাসে আক্রান্ত হলে জটিলতা বাড়ে, রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হামে আক্রান্ত বেশ কিছু শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, হামের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এডিনো ভাইরাসের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা উচিত।

শিশু হাসপাতালের পক্ষ থেকে এডিনো ভাইরাসের বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং তাদের রোগনিয়ন্ত্রণ সংস্থা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এ বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যে শিশু হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন।

জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এটি নতুন কোনো ভাইরাস নয়। এই ভাইরাসের উপস্থিতি অনেক বছর ধরে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে আছে। ১২ মাস থাকে। এটি মারাত্মক কোনো জীবাণু নয়। এই ভাইরাসের কারণে জ্বর, সর্দি, কাশি হয়। আক্রান্ত মানুষ সহজে ভালো হয়। কিন্তু হাম ও এডিনো ভাইরাসের সংক্রমণ একসঙ্গে হলেই জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

prothomalo-bangla%2F2026-08-03%2Fe8asyv9e%2FWhatsApp_Image_2026_08_01_at_4_57_59_PM.jpeg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

গত ২৩ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে হাম ব্যবস্থাপনাবিষয়ক সভায় বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের (শিশু হাসপাতাল) পক্ষ থেকে হাম ও এডিনো ভাইরাসের একই সঙ্গে সংক্রমণের বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। গতকাল রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাম ও এডিনো ভাইরাসের কো-ইনফেকশনের কথা আমি কখনো শুনিনি। শিশু হাসপাতালও বিষয়টি আমাদের জানায়নি। তারা তো আমাদের চিঠি লিখে জানাতে পারত।’ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সিডিসি-আটলান্টা জানতে পারল, আপনি জানতে পারলেন না, মিটিং তো হয়েছে আপনাদের অফিসে—এমন প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ সিডিসির প্রধান বলেন, ‘ওই মিটিংয়ের কথা আমি তো মনে করতে পারছি না।’

শিশু হাসপাতাল কী পেয়েছে
দেশে যে কটি হাসপাতাল হামে আক্রান্ত অধিকসংখ্যক শিশুকে চিকিৎসা দিচ্ছে, শিশু হাসপাতাল তাদের মধ্যে অন্যতম। দেশের অধিকাংশ জটিল রোগী এই হাসপাতালে পাঠানো হয়।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা লক্ষ করছিলাম হামে আক্রান্ত কিছু শিশু ভালো হচ্ছে না। কোনো ওষুধ তাদের ক্ষেত্রে কাজ করছে না। তখন আমরা কারণ খোঁজার চেষ্টা করি। শিশুদের অন্য কোনো সমস্যা আছে কি না জানার চেষ্টা করি।’

হাসপাতালের চিকিৎসকেরা হামে আক্রান্ত শিশুদের ‘রেসপিরেটরি প্যানেল টেস্ট’ শুরু করেন, বিশেষ করে যেসব শিশুর অবস্থা খারাপ এবং যাদের শরীরে কোনো ওষুধ কাজ করছে না। রেসপিরেটরি প্যানেল টেস্টের মাধ্যমে একসঙ্গে পাঁচ-ছয়টি ভাইরাস পরীক্ষা করা যায়। চিকিৎসকেরা দেখলেন, খুব খারাপ পরিস্থিতির শিশুরা হামের সঙ্গে এডিনো ভাইরাসেও আক্রান্ত। এ পর্যন্ত তাঁরা হামে আক্রান্ত ৩৫ শিশুর নমুনা পরীক্ষা করেছেন। এর মধ্যে ১৬ শিশুর নমুনায় এডিনো ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।

পরিচালক জানান, রেসপিরেটরি প্যানেল টেস্ট একটু ব্যয়বহুল। দেশের সব সরকারি হাসপাতালে এই পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই।

গত ২৩ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক সভায় শিশু হাসপাতালের পরিচালকের পক্ষে উপস্থিত একজন অধ্যাপক নতুন হাম ও এডিনো ভাইরাসের সহসংক্রমণের বিষয়টি উপস্থাপন করেন। ওই সভায় স্বাস্থ্য বিভাগের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক, হাম বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফের প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

দেশে হাম পরিস্থিতি খারাপ। কেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না, কেন প্রতিদিন হামে মৃত্যু হচ্ছে—এ নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন আছে। এডিনো ভাইরাসের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয় বিশেষ পদক্ষেপ নেবে, এটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তারা বিষয়টি বেমালুম এড়িয়ে গেছে, গুরুত্বই দেয়নি।

মির্জা জিয়াউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে। সিডিসির একজন প্রতিনিধি শিশু হাসপাতালে এসেছিলেন।

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হামে আক্রান্ত ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটে। তাদের ‘সাদা ফুসফুস’ লক্ষণ দেখা দেয়। সাদা ফুসফুস অর্থ যে ফুসফুস আর অক্সিজেন নিতে পারে না।

সিডিসির আগ্রহ
তিনটি সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৩ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সভায় উপস্থিত ছিলেন এমন একজন হাম বিশেষজ্ঞ শিশু হাসপাতালের হাম ও এডিনো ভাইরাসের সহসংক্রমণের বিষয়টি সংক্রামক রোগবিষয়ক একটি নেটওয়ার্কে জানিয়ে দেন। সেই নেটওয়ার্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি-আটলান্টা বাংলাদেশের বিষয়টি জানতে পারে।

সিডিসি আটলান্টা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করে, সংক্রমণের ওপর নজরদারি করে। সিডিসি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সঙ্গে কাজ করে, নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়। তারা বহুদিন ধরে আইসিডিডিআরবির সঙ্গেও কাজ করে আসছে। সিডিসি-আটলান্টা ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সিডিসি অফিসে যোগাযোগ করে। এরপর সিডিসি কর্মকর্তারা শিশু হাসপাতালে যান।

একটি সূত্র জানিয়েছে, সিডিসি-আটলান্টা থেকে একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসার সম্ভাবনা আছে। এই বিশেষ পরিস্থিতিতে কোন ধরনের সহায়তা দরকার, তা তারা জানতে চায়। তারা শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসতে চায়।

এত কিছু ঘটে গেলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা কিছু জানে না। বিশিষ্ট ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এই দুর্যোগের সময় শিশু হাসপাতাল থেকে একটি নতুন তথ্য জানা গেছে। এমন বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিছু জানবে না, কিছু করবে না, এটা খুবই দুঃখজনক। মেনে নেওয়া কঠিন।

মার্চ থেকে হামের প্রাদুর্ভাব
অনেকের ধারণা ছিল, দেশ থেকে হাম প্রায় নির্মূলের পথে। সেই ধারণা ছিল ভুল। এ বছর মার্চ মাসে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। অল্প সময়ের মধ্যে সারা দেশে হাম ছড়িয়ে পড়ে। নতুন বিএনপি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৫ এপ্রিল থেকে ১৮টি জেলার ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় হাম–রুবেলার টিকা দেওয়া শুরু করে। এরপর ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, বরিশাল ও ময়মনসিংহ—এই চার সিটি করপোরেশনে টিকা দিতে থাকে। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে হাম–রুবেলার টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন শুরু করে। ক্যাম্পেইন শেষ হয় ২০ মে।

স্বাস্থ্য বিভাগ ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষমাত্রা ঠিক করে। কিন্তু জুন মাসে ভিটামিন এ জাতীয় ক্যাম্পেইনের সময় জানা যায়, ওই বয়সী শিশু আছে ২ কোটি ২৬ লাখ। ৪৬ লাখ শিশুকে হিসাবের বাইরে রেখে সরকার ক্যাম্পেইন শেষ করে।

গতকালও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ১ হাজার ২২ জন চিকিৎসা নিতে আসে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে চারজন। এ নিয়ে এ বছর হামে মোট ৮৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

সাধারণত ধরে নেওয়া হয় যে ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে হাম নিয়ন্ত্রণে আসবে। জনস্বাস্থ্যবিদদের একটি অংশ সে রকমই আশা প্রকাশ করে গণমাধ্যমে বক্তব্য রেখেছিলেন। বাস্তবে তা হয়নি। হাম কেন নিয়ন্ত্রণে এল না, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে এডিনো ভাইরাসের বিষয়টি সামনে আনল শিশু হাসপাতাল।

 

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.