এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণসুবিধার টাকা পেতে ভোগান্তি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আপাতত আবেদনকারী অবসরপ্রাপ্ত প্রায় সব শিক্ষক-কর্মচারীকে তাঁদের প্রাপ্য সুবিধার একাংশের টাকা দেওয়া হবে। চাকরিকালীন তাঁদের কাছ থেকে মাসে যে টাকা কেটে রাখা হয়েছে, মূলত সেই অর্থ এখন দেওয়া হবে। বাকি টাকা পরে আবেদনের ক্রমিক অনুযায়ী দেওয়া হবে।
সে অনুযায়ী আপাতত একেকজন শিক্ষক অবসরসুবিধার জন্য সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং কল্যাণসুবিধার জন্য সর্বোচ্চ ২ লাখ ৩৯ হাজার টাকা পর্যন্ত পাবেন। তবে গ্রেড অনুযায়ী টাকার পরিমাণ কমবেশি হবে। এই প্রক্রিয়ায় কল্যাণসুবিধার জন্য গত ৩০ জুন পর্যন্ত আবেদন করা শিক্ষক-কর্মচারীরা এবং অবসরসুবিধার জন্য ৩১ জুলাই পর্যন্ত আবেদন করা শিক্ষক-কর্মচারীরা এই সুবিধা পাবেন। ১৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট এবং শিক্ষক ও কর্মচারী অবসরসুবিধা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবার অবসরসুবিধার টাকা পাবেন ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী। এ জন্য খরচ হবে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ৫৩ হাজার ৪৭৭টি আবেদনের বিপরীতে কল্যাণসুবিধা দেওয়া হবে। এ জন্য লাগবে প্রায় ৫৬৫ কোটি টাকা। একজন শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ও অবসর—এ দুই সুবিধাই পান। তাই দুটি খাতে ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৯৬টি আবেদনের বিপরীতে টাকা দেওয়া হলেও মোট শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা তার চেয়ে কম।
বর্তমানে হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী অবসরের পর মাসের পর মাস, বছরের পর বছর নিজেদের প্রাপ্য অর্থের জন্য অপেক্ষা করছেন। কেউ কেউ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেও টাকা হাতে পাননি। এ নিয়ে শিক্ষকসমাজে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এ অবস্থায় অন্তত আংশিক টাকা পাওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। তবে তাঁদের প্রত্যাশা, অবশিষ্ট টাকাও যেন দ্রুত দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে কল্যাণ ট্রাস্টের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা আশা করছেন এখন আংশিক টাকা দেওয়া হলেও সরকার হয়তো পরে এ খাতে তহবিল দেবে। তখন বাকি টাকাও দেওয়া হবে।
ভোগান্তি দূর হওয়ার আশা
সারা দেশে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ছয় লাখের বেশি।
তাঁদের অবসর ও কল্যাণসুবিধা পরিচালিত হয় দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট কল্যাণসুবিধার অর্থ দেয়। আর অবসরসুবিধার অর্থ দেয় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসরসুবিধা বোর্ড।
শিক্ষকদের চাঁদা, ব্যাংকে জমা থাকা টাকার সুদ এবং মাঝেমধ্যে সরকারের দেওয়া থোক বরাদ্দ ও বন্ড সুবিধার ভিত্তিতে এই টাকা দেওয়া হয়। অবসরসুবিধার জন্য চাকরিকালীন শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৬ শতাংশ প্রতি মাসে কেটে রাখা হয়। কল্যাণসুবিধার জন্য কাটা হয় আরও ৪ শতাংশ। ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই হারে চাঁদা নেওয়া হয়েছে। এর আগে অবসরসুবিধার জন্য ৪ শতাংশ এবং কল্যাণসুবিধার জন্য ২ শতাংশ হারে চাঁদা নেওয়া হতো।
এ ছাড়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বছরে ১০০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭০ টাকা অবসরসুবিধা ও ৩০ টাকা কল্যাণসুবিধা তহবিলে জমা হয়। বাকি অর্থ সরকার এবং জমা করা অর্থের সুদ থেকে সমন্বয় করা হয়।
সূত্রমতে, সর্বোচ্চ গ্রেডে অর্থাৎ অধ্যক্ষদের ক্ষেত্রে অবসরসুবিধা হিসেবে মোট প্রায় ৩৮ লাখ টাকা পাওয়া যায়। এর মধ্যে চাঁদার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা। কল্যাণসুবিধা হিসেবে একজন অধ্যক্ষ মোট ২০ লাখের বেশি টাকা পান। অন্যদিকে মাধ্যমিকের একজন সহকারী শিক্ষক অবসরসুবিধা হিসেবে পান প্রায় ১৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে চাঁদার পরিমাণ প্রায় ২ লাখ টাকা। আর একজন সহকারী শিক্ষক কল্যাণসুবিধা হিসেবে মোট প্রায় পৌনে ৭ লাখ টাকা পান। এর মধ্যে চাঁদার পরিমাণ প্রায় ৭৭ হাজার টাকা। কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এই টাকা আরও কম।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠানের সূত্র জানিয়েছে, মূলত এখন দুই প্রতিষ্ঠানে যে টাকা জমা আছে, তা দিয়েই এই আংশিক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
জানতে চাইলে অবসরসুবিধা বোর্ডের সচিব মো. মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এখন আবেদনকারী প্রায় সব শিক্ষক-কর্মচারীই তাঁদের চাঁদার টাকার অংশ পাবেন। বাকি টাকা যখনই আসবে, তখনই তা দেওয়া হতে থাকবে। তাঁর আশা, এখন এ বিষয়ে ভোগান্তি দূর হবে।