‘আড়ালের নায়ক’ থেকেই বিদায় রুবেলের

John Smith | আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৫:২৬ বিকাল

রুবেলকে বিদায়ী সম্মাননা দিল বিসিবি : শামসুল হক

প্রেসবক্সে তিনি এলেন আনুষ্ঠানিক বিদায়ের দিনে। এই কি প্রথম এলেন? কারও কারও কৌতূহল। রুবেল হোসেন ভুল ভাঙালেন, ‘এসেছিলাম বোধ হয় একবার, লোক কম ছিল। প্রেসবক্সটাও তখন অন্য রকম ছিল। এটা তো নতুন হয়েছে মনে হয়…।’

রুবেলের বর্ণনা ভুল নয়। অর্থাৎ মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের প্রেসবক্সে তিনি আগেও এসেছেন। তবু আজকের আসাটার বাড়তি তাৎপর্য আছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন গত ১৫ এপ্রিল। সেটি আনুষ্ঠানিক রূপ পেল আজ।

রুবেলের একসময়ের সতীর্থ তামিম ইকবাল এখন বিসিবি সভাপতি। বাংলাদেশ–নিউজিল্যান্ড দ্বিতীয় ওয়ানডের আগে তামিমের বোর্ড রুবেলকে মাঠে এনে বিদায়ী সংবর্ধনা দিল, যেখানে জাতীয় দলের সাবেক পেসার রুবেল এলেন ছেলে আয়ানকে নিয়ে।

দুই দলের খেলোয়াড় আর বিসিবি কর্মকর্তাদের সামনে সংক্ষিপ্ত বিদায়ী অনুষ্ঠানে আবেগাপ্লুত রুবেল কৃতজ্ঞতা জানালেন তাঁর একসময়ের সতীর্থদের প্রতি। তাঁদেরই একজন তাসকিন আহমেদ ফিরিয়ে আনলেন ২০১৫ বিশ্বকাপের স্মৃতি। অ্যাডিলেডে সেবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পরপর দুই বলে দুই উইকেট নিয়ে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন রুবেল।

এর কিছুক্ষণ পরই পেছনে ছেঁকে ধরা অসংখ্য ক্যামেরা নিয়ে রুবেল হাজির প্রেসবক্সে, সঙ্গে আয়ান। খেলোয়াড়ি জীবনে ক্যামেরার সামনে তাঁর মুখচোরা অভিব্যক্তিই দেখেছে সবাই, সংবাদ সম্মেলনে বরাবর ছিলেন লাজুক।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রুবেল হোসেন

 ম্যাচউইকেটসেরাগড়৪/৫
টেস্ট২৭৩৬৫/১৬৬৭৬.৭৭০/১
ওয়ানডে১০৪১২৯৬/২৬৩৪.৩১৭/১
টি–টুয়েন্টি২৮২৮৩/৩১৩২.৫৭০/০

দলের খারাপ দিনে আনুষ্ঠানিকতা সারার সংবাদ সম্মেলনগুলোতে যেমন অভিব্যক্তি, দুর্দান্ত বোলিং করে আসা দিনেও তার ব্যতিক্রম হতো না। উচ্ছ্বাস–উদ্বেগ, আনন্দ–হতাশা কোনোটাই ঠিক পুরোপুরি ফুটে উঠত না রুবেলের চেহারায়। সব সময় একই রকম। যেটা বেশি ফুটে উঠত, তা হলো নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা। রুবেল হোসেন যেন আড়ালেরই এক নায়ক হয়ে থাকতে চাইতেন সব সময়।

এদিনও যখন প্রেসবক্সে এক সাংবাদিক তাঁকে টক শোর আমন্ত্রণ জানালেন, লাজুক হেসে রুবেল বলেছেন, ‘আমি তো কথা ভালো বলতে পারি না। কী বলতে আবার কী বলে ফেলি…!’

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, রুবেল যেরকম আড়ালে থাকতে চাইতেন, নিয়তিও বরাবর তাঁকে সেদিকেই টেনেছে। হয়তো আগের ম্যাচেই ভালো বোলিং করেছেন, তবু পরের ম্যাচে টিম কম্বিনেশনের কারণে একাদশে জায়গা হয়নি। তাঁর সময়ে একাদশে পেস বোলিং কোটায় অগ্রাধিকার পেতেন মাশরাফি বিন মুর্তজা, মাশরাফির অধিনায়ক পরিচয়টারও থাকত বড় ভূমিকা। কাজেই রুবেল ডাগআউটে। চোট নেই, ভালো ফর্মে—তবু দলে তাঁর জায়গা পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না সব সময়।

prothomalo%2Fimport%2Fmedia%2F2020%2F07%2F03%2Fa2a9e9969d73b8e002732ee2ff7e7926-5eff5cd034d66.jpg?w=1536&auto=format%2Ccompress&fmt=webp

এরপর একটা সময়ে তাসকিন, মোস্তাফিজুর রহমানরা দলে এলেন। রুবেলের দলে জায়গা পাওয়ার প্রতিযোগিতা আরও বেড়ে গেল। টিম কম্বিনেশনের সঙ্গে যোগ হলো পেস বোলিংয়ে ডানহাতি–বাঁহাতি কম্বিনেশন, বোলিংয়ের ধরন—সব মিলিয়ে আরও পিছিয়ে যেতে থাকলেন রুবেল।

আবার যেদিন খেলতেন, বিপদের সময় তিনি হয়ে উঠতেন অধিনায়কের বড় ভরসা। উইকেট ফেলা যাচ্ছে না, ব্রেকথ্রু লাগবে; দুই–তিন ওভারের জন্য রুবেলকে নিয়ে আসো। খাঁচা থেকে বের হওয়া বাঘের মতো তেড়েফুঁড়ে বল করতেন রুবেল। উইকেট পেলে অদৃশ্য শিকল ভাঙার বুনো উল্লাসে শূন্যে ভাসতেন। লাজুক চোখে ফুটে উঠত ক্রোধের আগুন। কার প্রতি ক্রোধ থাকত, কে জানে!

সেই রুবেল আজ অবসরের আনুষ্ঠানিকতা সেরে ছেলেকে নিয়ে চলে গেলেন মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের মাঝখানে। উইকেটের পাশে গিয়ে বসলেন, ছুঁয়ে দেখলেন উইকেটটাকে। ‘হোম অব ক্রিকেটে’র প্রতি তাঁর এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ মনে করিয়ে দিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে শচীন টেন্ডুলকারের বিদায়ের দিনটাকে। শচীনও সেদিন ওয়াংখেড়ের উইকেটে দাঁড়িয়ে কেঁদেছিলেন, বিদায় বলেছিলেন প্রিয় ‘নার্সারি’কে।

রুবেলের আজ তেমনই দিন ছিল। ২০২১ সালের ১ এপ্রিল অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা টি–টুয়েন্টি ম্যাচটিই হয়ে থাকবে তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। শেষ ওয়ানডেও খেলেছেন সে বছরই, শেষ টেস্ট তার আগের বছর।

তার মানে গত ছয়–সাত বছর ধরেই রুবেল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অনুপস্থিত। এই কয় বছরে জাতীয় দলে ভিড় করেছে নতুন নতুন পেসার, যাঁদের অনেকে এখন বেশ অভিজ্ঞও হয়ে গেছেন। সে কারণেই ১৫ এপ্রিল রুবেল যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবসরের ঘোষণা দিলেন, মনে প্রশ্ন জেগেছে—এত দিনও কি তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছিলেন! তিনি না মোটর বাইক ব্যবসায়ী! কয়েক বছর ধরে এটাই তো পরিচয় হয়ে গিয়েছিল রুবেলের।

বিস্মৃতির আড়ালে হারাতে হারাতে ক্রিকেটার রুবেল আবার সামনে এলেন অবসরের ঘোষণা দিয়ে, যেন আগের মতোই ‘আড়ালের নায়ক’ হয়ে। রুবেলের ‘শেষ বাঁশি’র শব্দ মনে করিয়ে দিল তাঁর পুরো ক্যারিয়ারটাকেই। শুরুতে রুবেল বেশি পরিচিতি পেয়েছিলেন তাঁর বোলিং অ্যাকশনের জন্য। লাসিথ মালিঙ্গার মতো পুরোপুরি স্লিঙ্গিং অ্যাকশন নয়, আবার অনেকটাই সে রকম।

মনে আছে রুবেলের ব্যাপারে একবার কথা হচ্ছিল বাংলাদেশ দলের সেই সময়ের পেস বোলিং কোচ চম্পকা রমানায়েকের সঙ্গে। চম্পকা সব সময় ‘র’ রুবেলকেই পছন্দ করতেন, তাঁর কিছুটা অদ্ভুত বোলিং অ্যাকশনই পছন্দ ছিল তাঁর।

কথা প্রসঙ্গে শ্রীলঙ্কান এই কোচ বলেছিলেন, ‘এটাই রুবেলের শক্তি, এই অ্যাকশনের বোলিংয়ের কারণেই তো পেসার হান্ট থেকে তাঁকে নেওয়া এবং তাঁর জাতীয় দলে আসা। অ্যাকশন বদলানো নয়, এই অ্যাকশনেই ও কীভাবে আরও ক্ষুরধার বোলিং করতে পারে, সেই চেষ্টা করতে হবে।’

গত কয়েক বছরে ঘরোয়া ক্রিকেটেও অনেকটাই অনিয়মিত রুবেল। গত দুই বছরে খেলেছেন একটি মাত্র ম্যাচ, সেটিও ২০২৫ সালের জানুয়ারির বিপিএলে। সেই পর্যন্তও রুবেলের বোলিং অ্যাকশনে তেমন পরিবর্তন আসেনি। ঘরোয়া ক্রিকেটে যদি আবার কখনো তাঁকে দেখা যায়, তখনো নিশ্চয়ই রুবেল ‘র’ রুবেলের মতোই থাকবেন। সেই বোলিং অ্যাকশন, সেই মুখচোরা স্বভাব, নিজেকে আড়ালে রেখে হঠাৎই শিকল–ছেঁড়া বাঘের মতো লাফিয়ে ওঠা রুবেল।

 

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.