জলাতঙ্কের রোগী বাড়ছে, কিন্তু কুকুরকে টিকাদান রয়েছে বন্ধ

John Smith | আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৯:৪৬ সকাল

কুকুর

তিন বছর বয়সী শিশু আনাসের ছোট্ট হাতে ছিল খাবার। সেই খাবারের লোভে কাছে আসে একটি কুকুর। ভয়ে দৌড়ে বাসার দিকে ছুটলে—মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়ে কুকুরটি তার বাঁ হাতে কামড় বসায়।

গত ১৫ এপ্রিল সকালে রাজধানীর উত্তরখানে এ ঘটনা ঘটে। দ্রুত তাকে নেওয়া হয় মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। দেওয়া হয় জলাতঙ্কপ্রতিরোধী টিকা।

আনাসের বাবা ইমন প্রথম আলোকে বলেন, ‘কুকুরটা কার, জানি না। হঠাৎ করেই এসে কামড় দেয়। জলাতঙ্কের ভয়ে আছি। স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে তাই দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।’

kukur
রাজধানীতে এমন ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়—প্রতিদিনই কুকুরের কামড় বা আঁচড়ে আহত হয়ে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা, বাড়ছে জলাতঙ্কের ঝুঁকিও।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণের শিকার হয়ে এখানে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯৪ হাজার ৩৮০ জন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩ জনে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা আরও বেড়ে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩ জনে পৌঁছেছে। আর ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত সেবা নিয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫১ জন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, রোগীর এই ঊর্ধ্বগতির অন্যতম কারণ রাজধানীতে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কুকুরের টিকাদান কর্মসূচির স্থবিরতা।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ছোট–বড় বিভিন্ন বয়সী মানুষ চিকিৎসা নেন। হাসপাতাল–সংশ্লিষ্টরা বলেন, আগে হাসপাতালটিতে যে পরিমাণ রোগী আসতেন, এখন সেই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে কুকুরের কামড়ে বা আঁচড়ে আক্রান্তের হার উদ্বেগজনক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালে দায়িত্বরত একজন চিকিৎসক বলেন, ‘অনেকেই দেরিতে আসেন। কেউ প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিয়ে পরে আসেন। এতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।’

জলাতঙ্কের লক্ষণ দেখা দিলে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগী বাড়ার অন্যতম কারণ রাজধানীতে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং টিকাদান কর্মসূচির স্থবিরতা।

সব কুকুর নয়, র‍্যাবিস ভাইরাসে সংক্রমিত কুকুরের কামড়ই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। টিকা না দেওয়া কুকুরের আক্রমণে এই ঝুঁকি আরও বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাতঙ্ক এমন একটি রোগ, যার লক্ষণ প্রকাশ পেলে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যু ঘটে। ফলে প্রতিরোধই একমাত্র উপায়।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৩ সালে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় ৪২ জন মানুষের। ২০২৪ সালে ৫৮ জনের, ২০২৫ সালে ৫৯ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের।

হাসপাতাল–সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা দীর্ঘদিন কম থাকলে সম্প্রতি সেটা আবার বাড়ছে। বিষয়টি এখনই উদ্বেগের কারণ নয়। তবে দ্রুত সময়ে কুকুর নিয়ন্ত্রণ ও জলাতঙ্কপ্রতিরোধী ভ্যাকসিন মানুষ ও কুকুরের মাঝে ব্যাপক হারে দিতে হবে।

prothomalo-bangla%2F2026-04-18%2Flsi01nnq%2F2.jpeg?w=1536&auto=format%2Ccompress&fmt=webp

কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ

জলাতঙ্ক নির্মূলের লক্ষ্যে ২০১০ সাল থেকে দেশে একটি সমন্বিত কর্মসূচি চালু ছিল। এতে কুকুরকে টিকাদান, জন্মনিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা—সব কটি বিষয় একসঙ্গে পরিচালিত হতো।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচির আওতায় দেশের ৬০টির বেশি জেলায় প্রায় ২৯ লাখ কুকুরকে জলাতঙ্কপ্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়েছে। ৬৪ জেলায় প্রথম রাউন্ড, ৪৬ জেলায় দ্বিতীয় রাউন্ড এবং ৮ জেলায় তৃতীয় রাউন্ড টিকাদান সম্পন্ন হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো এলাকায় টানা তিন বছর অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরকে টিকা দেওয়া গেলে সেই এলাকা কার্যত জলাতঙ্কমুক্ত করা সম্ভব।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই কর্মসূচি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থ বরাদ্দ না থাকায় নতুন করে টিকাদান বা জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না। ফলে দ্রুত টিকা না পাওয়া কুকুরের সংখ্যা বাড়ছে। আর এসব কুকুর জলাতঙ্ক সংক্রমণের বড় উৎস।

সমন্বয়হীনতায় অচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

রাজধানী ঢাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের দেখভাল ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নেই। আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একটি জাতীয় কর্মসূচির আওতায় দেশজুড়ে বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণে কাজ করলেও বর্তমানে তাদের এ ধরনের কোনো সক্রিয় কর্মসূচি নেই। নেই কর্মসূচি শুরুর কোনো পরিকল্পনাও।

এদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানিয়েছে, কুকুর নিয়ন্ত্রণে তাদেরও নির্দিষ্ট কোনো কার্যক্রম বা উদ্যোগ এখন হাতে নেই। অন্যদিকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন অতীতে বেওয়ারিশ কুকুর ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও বর্তমানে এ খাতে কার্যকর পরিকল্পনা বা নিয়মিত কার্যক্রম নেই বলে জানিয়েছে।

ঢাকায় মোট কত বেওয়ারিশ কুকুর আছে—এ প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্যও নেই সিটি করপোরেশনগুলোর কাছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) জানিয়েছে, কোনো এলাকায় কুকুরের আক্রমণ বেড়েছে বা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, এমন অভিযোগ পেলেই তারা নিজস্ব ব্যাবস্থাপনায় ওই নির্দিষ্ট এলাকায় কার্যক্রম চালায়।

২০২৪ সালের আগে নিয়মিত কুকুর নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করত ডিএসসিসি। কিন্তু ২০২৪ সালের পর সেই কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আগে বছরে ৫০০টির বেশি কুকুর বন্ধ্যাকরণ করা হলেও গত প্রায় ২০ মাসে হয়েছে মাত্র ১৫০টির মতো।

ডিএসসিসির ভেটেরিনারি কর্মকর্তা শরণ কুমার সাহা বলেন, ‘টিকা সরবরাহ নেই, সমন্বয়ের অভাব আছে। তাই নিয়মিত কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) জানিয়েছে, তাদের নিজস্ব সক্ষমতা সীমিত। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করা হলেও কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।

ডিএনসিসির জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বলেন, কত কুকুর আছে, কোথায় ঝুঁকি বেশি—এই তথ্যও তাঁদের কাছে নেই। বেসরকারি সংস্থাগুলো কী কাজ করছে, সেটারও তেমন কোনো তথ্য তাঁদের কাছে নেই।

kukurjpg
জনবল ও কাঠামো না থাকায় কুকুর নিয়ন্ত্রণে কাজ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসির এই জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

রাস্তায় থাকা কুকুরদের নিজ উদ্যোগে খাবার দেন গণমাধ্যমকর্মী মাহফুজা হক। তিনি বলেন, কুকুরকে দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।তিনি বলেন, কুকুর কথা বলতে পারে না। তাই তাদের ভাষা বোঝারও কেউ নেই। কুকুর কাউকে কামড় বা আক্রমণ করলে ওই কুকুরের ওপর ক্ষোভ ঝাড়া সহজ। কিন্তু এটা কোনো সমাধান নয়। দরকার নিয়ন্ত্রণ ও জলাতঙ্কপ্রতিরোধী টিকা দেওয়া।

মাহফুজা হক বলেন, সিটি করপোরেশন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মিলে যৌথ উদ্যোগ নিলে কুকুর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। কিন্তু কুকুরেরও যে মানবিক দিক আছে, সেটা মাথায় রাখতে হবে।

পরিকল্পনা আছে, কার্যক্রম নেই

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশিদ বলেন, ‘জলাতঙ্ক প্রতিরোধে নতুন করে একটি পরিকল্পনা করছি। তবে এর আওতায় শুধু মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। কুকুরকে টিকা দেওয়া বা কুকুর নিয়ন্ত্রণের কোনো পরিকল্পনা এই মুহূর্তে নেই।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, কুকুর নিয়ন্ত্রণ বা টিকা দেওয়ার কার্যক্রম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করা উচিত নয়। বরং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এ বিষয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত।

তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানী কিংবা দেশের অন্য কোথাও কুকুর নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যক্রম এ মুহূর্তে অধিদপ্তর থেকে পরিচালিত হচ্ছে না।

এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন কোষের চিফ মো. হাবিবুর রহমান বলেন, পথকুকুরদের নিয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর নতুন করে একটি পরিকল্পনা করছে। তবে সেটা সম্পর্কে তিনি এখনই বিস্তারিত জানেন না।

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.