যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধানে যাবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে দুটি বিষয় ইতিমধ্যেই পরিষ্কার। এক. যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধাক্কা খেয়েছে। দুই. উপসাগরীয় দেশগুলো এক কঠিন ও অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো মূলত ‘হেজিং’ কৌশল অনুসরণ করে। অর্থাৎ তারা পুরোপুরি কোনো এক শক্তির ওপর নির্ভর না করে, একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো রক্ষাকর্তা এবং অন্যদিকে ইরানের মতো সম্ভাব্য হুমকির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকলেও, তারা কোনো বড় শক্তির কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নেয়নি।
তবে ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারা জানে, এই নিশ্চয়তা বিনা মূল্যে আসে না। তাই তারা যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি রাখতে নিজেদের দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি দিয়েছে এবং পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে।
কিন্তু গত ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের আস্থা কমতে থাকে। শুরুটা হয় যখন বারাক ওবামা প্রশাসন ২০১১ সালের আরব বসন্তকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দেয় এবং পরে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে ন্যাটো নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে অংশ নেয়।
এতে উপসাগরীয় দেশগুলো আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা ভাবতে থাকে, এ ধরনের অস্থিরতা তাদের দিকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। শুধু কাতার এটিকে সুযোগ হিসেবে দেখে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রভাব বাড়াতে চায়, যে সংগঠনটিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করে।
২০১৫ সালের জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। এই চুক্তি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার কথা বললেও, উপসাগরীয় দেশগুলো মনে করেছিল এটি খুব সীমিত পরিসরের।
এই চুক্তির মধ্য দিয়ে ইরান নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হয়ে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রক্সি শক্তিতে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারবে। তারপরও ওবামা এটি গ্রহণ করেন। এতে বোঝা যায়, ওয়াশিংটনে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রভাব কমে গেছে। আমদানি করা তেলের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা কমে যাওয়া এর সঙ্গে যোগ হয়। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
এরপর ক্ষমতায় আসেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২০১৮ সালে তিনি জেসিপিওএ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনেন। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন করে আশাবাদী হয়। এই সম্পর্ক জোরদার করতে বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্দেশ্যে বানানো আব্রাহাম অ্যাকর্ডস-এ স্বাক্ষর করে।
এরপরও ২০১৯ সালে ইরানের ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। একই প্রবণতা দেখা যায় জো বাইডেন প্রশাসনের সময়ও। ২০২২ সালে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলা চালালেও যুক্তরাষ্ট্র সে সময় সরাসরি তার বিরোধিতা করেনি।
এত কিছুর পরও উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার মানসিকতা থেকে বের হতে পারেনি। ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর তারা তাঁকে খুশি করতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং মার্কিন অস্ত্র কেনার দিকে জোর দিয়েছে।
কিন্তু এত কিছু করেও এসব দেশ আমেরিকার কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা পায়নি। সৌদি আরব বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক হলেও সামরিক শক্তিতে ২৫তম। সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিরক্ষা ব্যয়ে ২৪তম হলেও সামরিক শক্তিতে ৫৪তম। যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে পরামর্শ না করেই যুদ্ধ শুরু করে এবং ইরানের পাল্টা আঘাতের ভার তাদের ওপরই পড়ে।
আরও স্পষ্ট হয়ে গেছে—ট্রাম্পের জেসিপিওএ বা ইরান চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা ইরানকে থামায়নি, বরং উল্টো তাকে আরও সক্রিয় করেছে। এখন ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় মজুত রয়েছে যা কিনা প্রায় অস্ত্রমানের কাছাকাছি। পাশাপাশি তারা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বাড়িয়েছে এবং লেবানন, সিরিয়া ও ইয়েমেনে প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে শক্তিশালী করেছে।
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো আরও বেশি ‘হেজিং’ কৌশল নেয়। ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন চালানোর পর তারা রাশিয়া, ইউক্রেন এবং পশ্চিম—সব পক্ষের কাছেই নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে চায়।
২০২৩ সালে সৌদি আরব চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সম্মত হয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রকে যে বার্তা দেয়, তা হলো—তাদের বিকল্প আছে। একই সঙ্গে তারা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার কথা ভাবলেও গাজা যুদ্ধের কারণে পিছু হটে। এখন তারা বলছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে না।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করে।
কিন্তু এত কৌশল নিয়েও উপসাগরীয় দেশগুলোর তেমন লাভ হয়নি। এখন যদি যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ নিজেদের বিজয় ঘোষণা করে অঞ্চল ছেড়ে চলে যায়, তাহলে তাদের সামনে আরও শক্তিশালী ইরানের মুখোমুখি হতে হবে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, যুদ্ধ শেষের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের কোনো পরিকল্পনাতেই উপসাগরীয় দেশগুলোর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেই। এমনকি ইসরায়েলের লেবাননে হামলাও যুদ্ধবিরতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
এই পরিস্থিতিতে অন্যের কৌশলের ওপর নির্ভর না করে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য তাদের একটি যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সব দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা সম্মান করা হবে এবং বাইরের শক্তির চাপিয়ে দেওয়া সরকার পরিবর্তনের বিরোধিতা করা হবে।
প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে একটি একক অবস্থান নেওয়া। এর মধ্যে থাকতে পারে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, ইসরায়েল-লেবানন শান্তিচুক্তি এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আবার আলোচনা শুরু করা (কারণ, ইরান চুক্তি থেকে ট্রাম্প সরে যাওয়ার আগে তা কার্যকর ছিল)। এসবের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাব প্রয়োজন।
তবে এই ঐক্য গড়ে তোলা সহজ হবে না। কাতার ও ওমান ইরানের সঙ্গে এখন সমঝোতার পক্ষে। সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ, যদিও ভবিষ্যতে এ সম্পর্ক বদলাতে পারে। সৌদি আরব মাঝামাঝি অবস্থানে আছে। তারা ইরানের প্রতি বিরূপ, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সিদ্ধান্তেও অসন্তুষ্ট।
তবু বাস্তবতা হলো—দুর্বল শান্তি, ক্ষুব্ধ ইরান এবং অনির্ভরযোগ্য যুক্তরাষ্ট্রের মুখে উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে এর চেয়ে ভালো বিকল্প নেই।
জাকি লাইদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধির বিশেষ উপদেষ্টা।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ