আন্দামান সাগরের ঢেউয়ে বিলীন মালয়েশিয়ার স্বপ্ন

John Smith | আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৯:৩৫ সকাল

কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূল থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া একটি ট্রলার আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়ার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে পেকুয়ার এক ইউনিয়নের তিনটি গ্রামে।

ওই তিন গ্রামের সাত যুবকও ট্রলারে মালয়েশিয়া রওনা দিয়েছিলেন একই সময়ে। ট্রলারটি ডুবে যাওয়ার দিন ৮ এপ্রিল থেকে পরিবারের সঙ্গে আর মুঠোফোনে যোগাযোগ করেননি তাঁরা। সাত যুবকের ভাগ্যে কী ঘটেছে, জানতে চান পরিবারের সদস্যরা।

প্রচণ্ড বাতাস, উত্তাল সমুদ্র ও অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে ৮ এপ্রিল সকালে আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলার ডুবে যায়। এই ট্রলারে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা মিলে অন্তত ২৫০ জন নারী-পুরুষ ছিলেন। ৯ এপ্রিল দুপুরে ভাসমান অবস্থা থেকে আটজন পুরুষ ও একজন নারী উদ্ধার হলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

গণমাধ্যমে এই সংবাদ শুনে কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ–উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। টেকনাফ থানায় ধরনা দিচ্ছেন ইউনিয়নের তিন গ্রামের বেশ কয়েকজন মানুষ। তাঁরা জানান, আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ট্রলারটি যে সময়ে রওনা দেয়, কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূল থেকে ওই সময় আরও দুটি ট্রলারও মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ওই তিন ট্রলারের যেকোনো একটিতে ছিলেন রাজাখালীর সাত যুবক। ৮ এপ্রিল পর্যন্ত ট্রলার থেকে মুঠোফোনে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন তাঁরা। এরপর থেকে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন। ওই দিনই আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবির কথা জানতে পেরে আশঙ্কায় বুক কেঁপে ওঠে স্বজনদের। সাত যুবকের ভাগ্যে কী ঘটেছে, জানতে চান তাঁরা।

আন্দামান সাগর থেকে উদ্ধার হলেন যাঁরা
৯ এপ্রিল দুপুরে আন্দামান সাগর থেকে বাংলাদেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘মেঘনা প্রাইড’ নয়জনকে উদ্ধার করে। এরপর গভীর সমুদ্রে টহলরত বাংলাদেশের কোস্টগার্ডের জাহাজ মনসুর আলীর কাছে ওই রাতেই হস্তান্তর করা হয় তাঁদের। কোস্টগার্ড তাঁদের টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করে।

টেকনাফ থানার পুলিশ পরিদর্শক সুকান্ত চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, উদ্ধার করা নয়জনের মধ্যে তিনজন রোহিঙ্গা। বাকি ছয়জন বাংলাদেশি। কোস্টগার্ড যাঁদের হস্তান্তর করেছে, তাঁরা হলেন কক্সবাজার সদর উপজেলার সমিতি পাড়ার সুলতান আহমদের ছেলে মো. হামিদ (৩৩), মধ্যম নুনিয়ারছড়ার নজরুল ইসলামের ছেলে মো. আকবর (৩২), টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের বরডেইল এলাকার মো. তৈয়বের ছেলে মো. তোফায়েল (২৭), টেকনাফ সদর ইউনিয়নের ছোট হাবিবপাড়ার আবদুল গাফফারের ছেলে মো. সৈয়দ আলম (২৭), হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লাতুরিঘোনা এলাকার শামসুল আলমের ছেলে মো. সোহান উদ্দিন (১৯), চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মায়ানী ইউনিয়নের কোনারপাড়া এলাকার মো. এনামুল হকের ছেলে মো. মহিউদ্দিন হৃদয় (৪২), উখিয়ার কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের মৃত আবদুর রহিমের ছেলে মো. রফিকুল ইসলাম (২৪), হামিদ হোসাইনের ছেলে এনামুল্লাহ ওরফে ইমরান (১৯) ও জামতলী আশ্রয়শিবিরের হাবিল হোসাইনের মেয়ে রাহেলা বেগম (২৫)। এর মধ্যে রফিকুল, এনামুল্লাহ ও রাহেলা বেগম রোহিঙ্গা নাগরিক।

টেকনাফ থানার পুলিশ পরিদর্শক সুকান্ত চৌধুরী জানান, আদালতের মাধ্যমে তিন রোহিঙ্গার জবানবন্দি গ্রহণ করে ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাকি ছয়জনের বিরুদ্ধে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা রুজু করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া মামলায় ১০-১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

আঁই মালয়েশিয়া যাইরগই

অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন পেকুয়ার রাজাখালী ইউনিয়নের মিয়াপাড়ার আবদুর রহিমের ছেলে বেলাল উদ্দিন (২৫)। দেড় বছর আগে বিয়ে করে সংসারী হন। সংসারে আসে যমজ দুই সন্তান। তবে সন্তানদের জন্মের পর তাদের ভরণপোষণ ও চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে হাঁপিয়ে ওঠেন বেলাল। অটোরিকশা বিক্রি করে চিকিৎসা চালান। এতেও তাঁর চলছিল না। একপর্যায়ে সাত মাস বয়সী যমজ দুই ছেলেকে রেখে পাড়ি দেন অজানা পথে। ২ এপ্রিল সকালে চট্টগ্রামে কাজে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। রাত সাড়ে আটটার দিকে স্ত্রী সুমি আক্তারের (১৯) কাছে আসে শেষ ফোন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেন, ‘ভালা থাকিঅ।

পোয়াগুনরে চাইঅ। আঁই মালয়েশিয়া যাইরগই বোটত গরি। হর্জ গরি অইলেও হনডইল্ল্যা পোয়াগুনরে দুধ আর ওষুধর ব্যবস্থা গইজ্জ। আঁই মালয়েশিয়া পৌঁছি ফোন দিয়ম।’ (ভালো থেকো। আমি নৌকায় মালয়েশিয়া যাচ্ছি। ধার করে হলেও ছেলেদের দুধ আর ওষুধের ব্যবস্থা করবে। আমি মালয়েশিয়া গিয়ে ফোন করব।)

prothomalo-bangla%2F2026-04-18%2F89fjga0e%2F2.PNG?w=1536&auto=format%2Ccompress&fmt=webp

এরপর সুমি আক্তার আর কোনো খোঁজ পাননি বেলালের। স্বামীর খোঁজ না পেয়ে দিশাহারা সুমী আকতার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার স্বামী দালালের খপ্পরে পড়েছেন। দালালেরা হয়তো বড় বড় স্বপ্ন দেখিয়েছে। টাকাপয়সা ছাড়া মালয়েশিয়া নেওয়ার কথা বলেছে। এ কারণে তিনি গেছেন। নইলে মালয়েশিয়া যাওয়ার মতো টাকা আমার স্বামীর ছিল না। আপনারা চেষ্টা–তদবির করে আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দেন।’

পেকুয়ার রাজাখালী ইউনিয়নের নিখোঁজদের মিয়াপাড়ার আবদুর রহিমের ছেলে মো. বেলাল (২০) ছাড়াও আছেন একই গ্রামের আবদুল মালেকের ছেলে মো. রহিম (২০), হাজিরপাড়ার শহিদুল ইসলামের ছেলে মো. সোহেল (২১), আহমদ ছবির ছেলে মো. এহেসান (১৯), নুরুল আমিনের ছেলে রাশেদুল ইসলাম (১৯), নতুন ঘোনার বাদশা মিয়ার ছেলে রহুল কাদের (২২) ও শহিদুল্লাহর ছেলে মানিক (২৪)।

নিখোঁজ সাত যুবক পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী ইউনিয়নের হাজীপাড়া, মিয়াপাড়া ও নতুনঘোনা এই তিন গ্রামের বাসিন্দা। গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজাখালী ইউনিয়নের মিয়াপাড়া, হাজিরপাড়া ও নতুনঘোনা এলাকায় নিখোঁজ যুবকদের পরিবারে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। প্রতিটি ঘরেই চলছে আহাজারি।

পরিবারের সদস্যরা বলেন, ৪ এপ্রিল সাতজন ট্রলারে টেকনাফ উপকূল থেকে রওনা দেন। রওনা দেওয়ার আগে ও পরে ওই যুবকদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে স্বজনদের যোগাযোগের হলেও ৮ এপ্রিল থেকে পুরোপুরিভাবে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। টেকনাফের দালালেরাও ফোন ধরছেন না।

নিখোঁজ এহেসানের মা মোহছেনা বেগমের শঙ্কা, ট্রলারডুবিতে তাঁর ছেলে হারিয়ে গেছেন। বিলাপ করতে করতে মোহছেনা বলেন, ‘আমার ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল ৪ এপ্রিল ট্রলারে ওঠার পর। সে বলেছিল, আম্মু চিন্তা করিয়ো না, পৌঁছে ফোন দেব। আমি সেই থেকে অপেক্ষায়। এখনো এল না ফোন। আমার বুকের ধনকে বুকে পেলে হবে। দুনিয়ায় আমার আর কিছু দরকার নেই খালি ছেলেটারে পাইলেই হইবো, দুনিয়ায় আমার আর কিছু দরকার নাই।’

নিখোঁজ মো. সোহেলের বাবা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ছেলেটা এখনো দেশ দুনিয়া ভালো করে বোঝে না। কেউ তার মাথায় এসব উল্টাপাল্টা ঢুকিয়েছে। তার দুশ্চিন্তা এখন আমাদের ঘিরে ধরেছে। ট্রলারডুবির ঘটনা শোনার পর থেকে ঘরে সবার নাওয়া খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।’

নিখোঁজ রাশেদের মামা মোহাম্মদ দিদার (৪০) টেকনাফ থানায় গিয়ে কোনো কার্যকর সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘ছবি আর ঠিকানা নিয়েই থানা-পুলিশ আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছে। বলেছে খোঁজ পেলে জানাব।’

স্থানীয় রাজাখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য নেজাম উদ্দিন নেজু বলেন, ‘আমার ধারণা, টেকনাফের দালাল চক্রটির সঙ্গে স্থানীয় একটি দালাল চক্রও মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত। চক্রটি এলাকার অল্পবয়সী, বেকার, ঋণগ্রস্ত, অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানগুলোকে টার্গেট করেছে। শিগগিরই একটা বিহিত করতে না পারলে এলাকার আরও অনেক পরিবারকে সর্বস্বান্ত করে দেবে চক্রটি।’

পানির ড্রাম ও কাঠের টুকরা ধরে ভেসে ছিলেন তাঁরা

উদ্ধারকারীদের বরাত দিয়ে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ৯ এপ্রিল দুপুরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় আটজন পুরুষ ও একজন নারীকে উদ্ধার করে বাংলাদেশি জাহাজটি। গভীর সমুদ্রে বেশ কিছু মানুষকে পানির ড্রাম ও কাঠের টুকরা নিয়ে ভাসমান অবস্থায় দেখতে পান তাঁরা। পরে মধ্যরাতে কোস্টগার্ডের কাছে তাদের হস্তান্তর করা হয়।

লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন আরও বলেন, ‘ট্রলারডুবির ঘটনা যেখানে ঘটেছে, সেখানে আসলে কী হয়েছে বা কতজন ট্রলারে ছিল, সে বিষয়ে আমাদের জানার সুযোগ ছিল না। আমাদের কাছে নয়জনকে হস্তান্তর করার পর আমরা তাদের দেশে নিয়ে আসি।’

কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিখোঁজদের কোনো হদিস এখন পর্যন্ত মেলেনি এবং ডুবে যাওয়া ট্রলারটিরও কোনো ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি।

prothomalo-bangla%2F2026-04-18%2F9zmvs948%2F3.PNG?w=1536&auto=format%2Ccompress&fmt=webp

পাচারকারীদের খপ্পরে দরিদ্র পরিবারে তরুণেরা

২০১৫ সালে মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী ঘন জঙ্গলে মানব পাচারকারীদের পরিত্যক্ত আস্তানায় গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়, যা আন্তর্জাতিকভাবে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। এরপর থেকে মানব পাচার প্রতিরোধ নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকায় কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা ফিল্মস ফর পিস ফাউন্ডেশন।

চার বছর ধরে কক্সবাজার অঞ্চলে মানব পাচার প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করছে সংস্থাটি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক পারভেজ সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচার প্রতিরোধ নিয়ে দেশের পথে প্রান্তরে কাজ করে বুঝেছি দেশে বেকারত্ব বৃদ্ধিই মানব পাচারের একটি বড় কারণ। দালালেরা মূলত অসহায় শ্রেণির দরিদ্র পরিবারের বেকার ও অভাবী মানুষগুলোকে টার্গেট করে থাকে এবং বিনে পয়সায় মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার লোভ দেখায়। বলে মালয়েশিয়া পৌঁছে টাকা দিলেই হবে। বিশাল অঙ্কের বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়েই বোটে তুলে তাদের। ’

তিনি বলেন, ‘মানব পাচারের এই বিশাল নেটওয়ার্ককে ভাঙতে হলে আমাদের আরও লোকবল দরকার। সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে এবং আইনকে কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।’

Your experience on this site will be improved by allowing cookies.